ইউজিসি ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন

১৯৭৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার নং- ১০(১৯৭৩)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। প্রতিষ্ঠানকালীন এর মৌল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন নিরংকুশ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের  চাহিদা অনুসারে অর্থ সরবরাহের ব্যবস্থা করা। সে সময় ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যার মধ্যে চারটি সাধারণ বিষয়ে এবং বাকি দুটির মধ্যে একটি ছিল কৃষি বিদ্যালয় ও অন্যটি ছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সে সময় ইউজিসির চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। আমলারা যাতে মঞ্জুরি কমিশনে কখনো নাক না গলান, শিক্ষকদের মান-মর্যাদা ও আত্ম-সম্মান যাতে বজায় থাকে এবং প্রতিষ্ঠানটিতে যাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য না ঘটে এই ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু অনেক সচেতন ছিলেন। প্রফেসর নীলিমা ইব্রাহীমের লেখায় দেখা যায় যে, জাতির পিতার সুগভীর আগ্রহ ছিল আমলামুক্ত পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যেন পরিচালিত হয় এবং শিক্ষকরা স্ব-উদ্যোগে নিজেদের মান-মর্যাদা ও জ্ঞান-গবেষণার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হোন।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে-বিশেষ করে শিক্ষার আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে সচেষ্ট রয়েছেন। ফলে দেশে এখন ৪৯টি সরকারি এবং ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষকদের নিজস্ব দায়িত্ব জ্ঞান সম্পর্কে সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের দায়িত্বের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের  মতো এদেশেও আমলাতান্ত্রিকতা মুক্ত পরিবেশে বজায় রাখা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমাদের বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ অনুসরণ করে কাজ করতে হবে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা গত দশ বছরে অনেকগুণ প্রসারিত হলেও মঞ্জুরি কমিশন স্থাপনের সময়ে যেখানে দু’জন পূর্ণকালীন সদস্য ছিলেন এখন সেখানে পাঁচ জন পূর্ণকালীন সদস্যের সংস্থান করা হয়েছে। এই সংখ্যা আরো বাড়ানো কি জরুরি নয়? মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকাণ্ড বাড়লেও এখন পর্যন্ত নতুন ভবন স্থাপিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গাদাগাদি করে বসতে হয় বলে বিভিন্ন সময়ে কার্য উপলক্ষে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে অধিক হারে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গুণগতমান বৃদ্ধিকল্পে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সার্বিক কল্যাণে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষকদের আরও আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা,  স্বল্পকালীন সময়ের জন্যে বিভিন্ন কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষণের জন্যে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। দেশি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পিএইচডির সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্যে বারবার তাগাদা দিলেও অনেকে যাচ্ছে না। তবে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়েছে।

আমরা জানি, ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে IQAC চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রেও বর্তমানে মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান সচেষ্ট রয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। উপরন্তু ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন  ডলার "HEAT" শীর্ষক একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শিক্ষার মানোন্নয়নে আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় নানামুখী পদক্ষেপ বিশেষত উন্নত শিক্ষা এবং নারীদের শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পসহ বিবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের জন্য অবশ্য সত্, কর্তব্যনিষ্ঠ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জাতীয় কোর কমিটির শিক্ষাকার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। বর্তমান সরকার প্রধান যেখানে আগামী পাচ বছরে ১.২৮ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে, সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সেই প্রক্রিয়াকে আরো জোরালো করতে পারে।

ইউজিসিতে অতিরিক্ত লোকবল পদায়ন করে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত জার্নালগুলোর ব্যংকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে বরং লিখিত, প্রেজেন্টেশান ও ভাইভার ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষা প্রদান ও গবেষণার প্রতি নিষ্ঠাবান হতে হবে। এদেশে শিক্ষানীতি ২০১০ আইন প্রণয়ন অদ্যাবধি সম্ভব হয়নি। এখন এ্যাক্রেডেন্সিয়াল কাউন্সিল স্থাপন করা হলেও কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থায় লাল ফিতার দৌরাত্ম্য চলছে। মালেয়শিয়ান ফ্রেইমওয়ার্ক বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে খাটবে না। একজন প্রকৃত শিক্ষকই পারেন দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিতভাবে কাজ করতে। উচ্চশিক্ষা কমিশন যেন সম্পূর্ণরূপে আমলাতন্ত্রমুক্ত থেকে বঙ্গবন্ধুর চেতনায় পরিচালিত হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখার জন্য অনুরোধ থাকল।

n লেখক : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

ই-মেইল: pipulbd@gmail.com