প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় আমার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ কাঁদতো, যে জাতির জন্য সর্বক্ষণ ভাবতেন আমার মা বেগম মুজিব, সেই বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই যেন বিশ্ববাসী বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। তিনি বলেন, আমার বাবা এদেশের মানুষের জন্য সারাজীবন যে কাজ করে গেছেন সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আমি কাজ করি। আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানই আমার একমাত্র ভাবনা।
গতকাল রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ রিং-রোডে এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ সব কথা বলেন। এর আগে তিনি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের বোরিং কার্যক্রম এবং নগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
বঙ্গবন্ধু টানেলের বোরিং কাজের উদ্বোধনকে উন্নয়ন যাত্রার নতুন পদক্ষেপ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১০ সালে এ টানেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলাম। এ সময় তিনি চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তিনি আজ বেঁচে থাকলে সবচে বেশি আনন্দিত হতেন। প্রধানমন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণে সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, চীন যেখানে এ ধরনের প্রকল্পের জন্য সাধারণত ৮৫ ভাগ ঋণ সহায়তা দেয়, সেখানে তারা এ টানেলের জন্য দিয়েছে শতভাগ সহায়তা। ২০২২ সালে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণ শেষ হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উন্নয়ন হলেই কিছু মানুষের গায়ে জ্বালা ধরে। অপপ্রচার চালায়। দুজন সম্পাদক ও একজন সুদখোরও বর্তমান সরকারের নামে যে অপপ্রচার করছে একথা সবাই জানেন। পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংককে বলেছিলাম দুর্নীতির প্রমাণ দেখান। তারা দেখাতে পারেনি। অবশেষে আমরা নিজেরাই নিজেদের অর্থে আল্লাহর রহমতে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলাম। পদ্মা সেতু আজ সবার সামনে দৃশ্যমান।
প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়নে তার সরকারের ব্যাপক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, যেহেতু আনোয়ারা-পটিয়া-কক্সবাজার সড়ক চার লেনে উন্নীত হয়েছে কাজেই টানেলে এপ্রোচ রোডের আনোয়ারা অংশে আরো ১০ কিলোমিটার সড়ক পটিয়া অংশে যুক্ত করে দেব। আর লালখান বাজার থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে জনগণের যাতায়াত সহজ হয়ে আসবে। এ সব উদ্যোগ চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজে আসবে। তিনি চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ের মাধ্যমে যাতে সরাসরি কক্সবাজার চলে যাওয়া যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণেও সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছেন বলে উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা এদেশের মানুষকে স্বাধীনতা ও সংবিধান উপহার দিয়েছেন। আমরা দায়িত্ব নিয়ে খাদ্য ঘাটতির দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি, মাত্র ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে ২০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন করছি, সন্দ্বীপে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুত্ সংযোগ প্রদান করেছি। ছোট ছোট দ্বীপাঞ্চলগুলোকেও উন্নয়নের আওতায় এনেছি। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে পায়রা বন্দর ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় করে দিয়েছি। দেশের দারিদ্র্য সীমা ৪০ ভাগ থেকে অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে এনেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। এক সময় পঁচাত্তরের পর যখন বাইরে ছিলাম, তখন শুনতে হয়েছে, বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের দেশ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের দেশ। এগুলো শুনে খুব কষ্ট লাগত। কাজেই সেই দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যেন সারা বিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পাশে থাকার জন্য বন্ধু দেশসমূহের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা সবাই আমাদের সহযোগিতা করেছে বলে বাংলাদেশের উন্নয়নের কাজ আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ইনশাল্লাহ এগিয়ে যাবে।
টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ায় দেশবাসীর প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পেরেছি বলেই আজকে টানেলের বোরিং কাজ উদ্বোধন করতে পারলাম। ইনশাল্লাহ এ টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রামের গোটা অঞ্চল আরো সমৃদ্ধশালী হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়ে গেলে দেশের উত্তরাঞ্চল আরো উন্নত ও সমৃদ্ধশালী হবে। ঐ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। ৭ দশমিক ৮৬ আমাদের বর্তমান জিডিপি। এটা আমরা ডাবল ডিজিটে নিয়ে যাব।
২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনসহ মুজিব বর্ষ উদযাপনের জন্য চট্টগ্রামবাসীকে পৃথকভাবে কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে উঠবে। পাশাপাশি ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ। তখন হয়তো আর বেঁচে থাকব না। কিন্তু আমাদের যে নতুন প্রজন্ম তারা সে দিন বাংলাদেশে একটা উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশের নাগরিক হিসেবে শতবর্ষ উদযাপন করবে বলে আশা রাখি। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে শেষে উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
সুধী সমাবেশে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বপ্ন নিয়ে জেগে আছেন বলেই বাংলাদেশ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কর্ণফুলী টানেলের নামকরণ করা হয়েছে চট্টগ্রামবাসীর অনুরোধে। তিনি বলেন, মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কের চিন্তা-ভাবনা চলছে। আগামী ঈদের আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিনটি চার লেনের সেতু দৃশ্যমান হবে। ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল করার চিন্তা-ভাবনাও হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে তিন বাহিনীর প্রধান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত মি. জেং জুয়া উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপাসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতা ও এমপিরা উপস্থিত ছিলেন।