মহানগরীর জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত পুকুর কিংবা জলাশয় এখন আর অবশিষ্ট নেই চট্টগ্রামে। গত এক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভরাট ও বিলীন হয়ে গেছে বহু পুকুর জলাশয়। খোলা জলাশয়ের অভাবে নাগরিক জীবনে বাড়ছে নানা সমস্যা। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুন লাগলে নেভানোর পানি সরবরাহেরও তেমন কোন উত্স খুঁজে পাওয়া কঠিন।
স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ, বাড়িঘর, এপার্টমেন্টসহ নানাবিধ নগর সংস্কৃতির বলি হচ্ছে নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুকুর, দীঘি ও জলাশয়। গত দেড় দশকে নানা প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুইশ’ পুকুর, জলাশয় আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ ভরাট করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির অজুহাতে জমির মালিকরা পুকুর, দীঘি, জলাশয় ভরাট করে ফেলছে। মাটি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে এইসব জলাশয়ের পরিচর্যাও বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। কোন কোন পুকুরের মালিক আইনি জটিলতা এড়াতে পুকুর ভরাটের জন্য পুকুরকে প্রত্যাহিক ময়লা আবর্জনা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করেছেন। ফলে পুকুর-জলাশয়গুলো দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও গভীর রাতে ট্রাকভর্তি মাটি, বালি ও ময়লা-আবর্জনা এনে পুকুর জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে। পরিবেশ কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকার চট্টগ্রাম মহানগরীতে যেখানে প্রায় ৫শ’ পুকুর জলাশয় প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে মোট দেড়শ’ জলাশয়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
পরিবেশ কর্মী শরীফ চৌহান বলেন, নগরীর বেশিরভাগ পুকুর-জলাশয় ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে পুকুর জলাশয় ভরাটের কারণে পরিবেশ ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে। গত দুই-তিন দশকে নগরীতে কী পরিমাণ পুকুর জলাশয় বিলীন হয়েছে তা শীঘ্রই অনুসন্ধান করে দেখা উচিত। মহানগরীতে জনগণের বহুমুখী নিরাপত্তার জন্য কী পরিমাণ জলাশয় থাকা দরকার তা নিশ্চিত করে জানানোর দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনের। তিনি জানান, নগরীর মোহাম্মদপুর, চান্দগাঁও, হালিশহর, চকবাজার ও বাকলিয়া এলাকায় গত এক দশকে বহু পুকুর জলাশয় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। কিছু হয়েছে রাতের আঁধারে, আর কিছু প্রকাশ্যে। বর্তমানে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আসকার দীঘিটিকে রক্ষা করার জন্য নানা রকম প্রচেষ্টা করছে বিভিন্ন মহল। এই দীঘিটিকে রক্ষার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এ কাজটি সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে করা যেতে পারে। ৪০ লক্ষ জনসাধারণের নগরীতে কী পরিমাণ পুকুর জলাশয় দরকার তা যথাযথ জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
পরিবেশ অধিদপ্তর মহানগরীর উপ-পরিচালক শহিদুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, যারা নগরীতে পুকুর-জলাশয় ভরাট করছে তারা এর ক্ষতিকর দিকটি জেনে শুনেই তা করছে। এর সাথে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত। কিন্তু নগরীতে পুকুর, জলাশয়, দীঘি সরকারি-বেসরকারি যাদেরই মালিকানাধীন হোক না কেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া সেগুলো ভরাট করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনবোধে পুকুর, জলাশয় ভরাটকারীদের তা পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেবে পরিবেশ অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম বিভাগে পুকুর জলাশয় ভরাট করার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০/১১টি মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।