পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকার অগ্নিদগ্ধ ওয়াহেদ ম্যানসনের বেসমেন্টে ২৮ ট্রাক কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পাওয়া গেছে। এসব দাহ্য পদার্থ কেরানীগঞ্জের একটি গুদামে নিয়ে রাখা হয়েছে। পরে এগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এক্সিকিউটিভ রেজিষ্ট্রার মাসুদ রানা।
গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘রবিবার ওয়াহেদ ভবনের সকল কেমিক্যাল জাতীয় দাহ্য পদার্থ সরানো হয়েছে। যেহেতু ভবন মালিকের এখনও দেখা পাওয়া যায়নি, আপাতত কেরানীগঞ্জের একটি জায়গায় নিয়ে সেগুলো রাখা হয়েছে।’
এর আগে চুড়িহাট্টাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওয়াহেদ ভবনের বেসমেন্টে গোপনে মজুদ করে রাখা রাসায়নিকের বস্তা মাথায় নিয়ে একের পর এক বের হচ্ছিলেন শ্রমিকরা। রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাকে তোলা হচ্ছে সেগুলো। পাশে দাঁড়িয়ে তদারক করছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সঙ্গে ছিলেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের একজন রেজিস্ট্রার। খাতা-কলম নিয়ে বসে আছে মালিকপক্ষের লোকজন। তাদের মধ্যে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এগুলো সিটি করপোরেশন নিলেও পরে তাদেরকে ফেরত দিতে হবে। কারণ এটি ব্যবসায়ী পণ্য।’ ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের করা কেমিক্যালের হিসাব ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রাখা হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত, শনিবার দুপুর থেকে অবৈধভাবে মজুদ করা এসব রাসায়নিক সরানোর কাজ শুরু হয়।
গত বুধবার রাতে চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় পুড়ে মারা গেছে ৬৭ জন। দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছে বেশ কয়েকজন। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ভবনের মধ্যে ওয়াহেদ ম্যানসনের বেসমেন্টে রাখা বস্তা ও ড্রামভর্তি রাসায়নিক অক্ষত থেকে যায়। ভবনটির মালিকদের দেখা নেই। ভবনটির মালিক হাজী ওয়াহিদ অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁর ছেলে সোহেল ও হাসান বর্তমানে বাড়ির মালিক। ঘটনার পর থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত তাঁরা ভবনে ঢোকেননি বলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। পুলিশ জানায়, তাঁরা এখন মামলার আসামি। তাঁদেরকে খোঁজা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা :গতকাল সকাল থেকেই ছিল ওয়াহেদ ভবনের সামনে সাধারণ মানুষের ভিড়। সেখানে ওয়াহাব সিকদার নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা হয়। ওয়াহাব বলেন, তিনি গোলাম রহমান নামে এক আইনজীবীর প্রাইভেটকার চালক। গাড়ির নাম্বার ঢাকা মেট্টো-খ ১১-৮৪-১৫। ঘটনার রাতে চুড়িপট্টি দিয়ে তিনি গাড়ির মালিকের চার স্বজনকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাড়ির পেছনে হঠাত্ আগুন দেখতে পান তিনি। এরপর কোনমতে গাড়ি ফেলে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান তারা। তিনি বলেন, খুব দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাত্ক্ষণিকভাবে কীভাবে আগুন লাগে তার চোখে পড়েনি। তবে দূর থেকে মনে হয়েছে, কোন গাড়ির ‘সিলিন্ডার’ থেকে আগুন লেগে কেমিক্যালের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
কথা হয় দুদু মিয়া নামের আরেক গাড়িচালকের সঙ্গে। তিনিও সেই রাতের ঘটনার সাক্ষী। তিনি বলেন, তিনি পিকআপ চালক। সেই রাতে সাভার থেকে নিজের পিকআপ নিয়ে চুড়িপট্টির ওয়াহেদ ভবনের নাহিদ নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্লাস্টিকের দানা নিতে এসে বিপদে পড়েন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পিকআপটি ওয়াহেদ ভবনের সামনে দাঁড় করে রেখে সহকর্মী ফারুককে নিয়ে পাশের রাজ হোটেলে ঢোকেন। হোটেলে ঢোকার পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ও আগুন দেখতে পান। এরপর দ্রুত হোটেল থেকে বের হয়ে নিরাপদ জায়গায় যান। তিনি দাবি করেন, তার গাড়িতে কোন সিলিন্ডার ছিল না। নিচ থেকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন লেগে ওয়াহেদ ভবনসহ আশপাশে ছড়ায় বলে তিনি মনে করেন।
‘এহন পোলাডাও চইলা গেল’: এদিকে এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি ঘটনাস্থল। পুড়ে যাওয়া ভবনগুলোতে নিহতদের স্মরণে কালো ব্যানার টানানো হয়েছে। সেখানে এখনো নিহতদের স্বজনরা ঘুরাঘুরি করছেন। তেমনই একজন নাসির উদ্দিন। আগুনে তার একমাত্র ছেলে ওয়াসি উদ্দিন মাহিতকে হারিয়েছেন তিনি। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, মায়ের ওষুধ কিনতে এসে ছেলে আগুনে পুড়ে মারা যায়। এর আগে মেয়ে নুরে আজরিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তিনি বলেন, ‘আগুন কীভাবে লেগেছে তার চেয়ে বড় কথা আগুন ছড়িয়েছে ক্যামিকাল বা রাসায়নিকের কারণে। তাই এ এলাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরাতে হবে। এমন ভয়াবহ আগুনে জীবনে দেখিনি। ছেলেকে হারিয়ে আমার স্ত্রী ও আমার বাঁচার অবলম্বনও শেষ হয়ে গেছে। এর আগে মেয়ে হারিয়েছি। ‘এহন পোলাডাও চইলা গেল।’
এরপরই কথা হয় ওয়াহেদ ভবনের বেসমেন্টের সামনের ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে। ওই বাসার গেটে দাঁড়িয়ে থাকা খাতিবুর রহমান (চার্টার্ড একাউন্টেন্ট) বলেন, আগুনের ঘটনায় তার পরিবারের লোকজনও বিপদে ছিল। তার ভবনের সামনেও আগুন ছড়িয়েছিল। তবে অল্পের জন্য তার পরিবারের লোকজন রক্ষা পায়। তিনি বলেন, আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল বা দাহ্য পদার্থের ব্যবসা থাকা উচিত্ নয়। এটা উচ্ছেদ করতে হবে। তা নাহলে ফের আগুন লাগলে আরো প্রাণহানি ঘটবে।