অন্য তামিম, নতুন বাংলাদেশ

 
শীত আসি আসি করছে। রোদ থাকলেও তাতে অসহ্য লাগে না। সাথে মিহি একটা বাতাস। গায়ে লাগে; তবু ঠান্ডা লাগে না। সন্ধ্যা হলে ঠান্ডা অনভূতি বাড়ে; কিন্তু সেটাও ততটা নয়।
ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মের কাছাকাছি এই আবহাওয়া পেয়েই কি না বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, বিশেষ করে তামিম ইকবাল একেবারে চিরায়ত ‘ইংলিশ টেস্ট ব্যাটিং’ করলেন সারা দিন জুড়ে!
সকাল আর দুপুরটা একেবারে কেতাবি টেস্ট ব্যাটিং; শেষ বিকেলে রান রেট বাড়িয়ে নেয়ার জন্য কিছুটা আক্রমনাত্মক ভঙ্গী—এ যে ষাটের দশকের ইংল্যান্ডের আগাম গ্রীস্মের কোনো এক টেস্ট। পার্থক্য শুধু এখানে পেসারদের জন্য কিচ্ছু নেই; মুভমেন্ট নেই, বাউন্স নেই, গতি নেই; উইকেট নিয়ে উত্সবও তাই নেই। দিন শেষে তাই মাত্র তিনটি উইকেট হারিয়ে ১৯৩ রান রান বাংলাদেশের।
সকালে সামশুর রহমান শুভ’র উইকেটটা বাদ দিলে সব ঠিক ঠিকঠাক। পেসারদের জন্য কিছু নেই তো বটেই; নিখাঁদ ব্যাটিং উইকেট বলতে যা বোঝায় উইকেটটা ঠিক তেমন ছিল না। প্রথম সেশনের শেষেই উইকেটে স্পিনাররা টার্ন পেতে শুরু করেন। শেষ বেলায় এসে ম্যালকম ওয়ালারের একটু বেশি গতির এক টার্নারে উইকেটের পিছনে ক্যাচও তুলে দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল।
এটুকু বাদ দিলে, গোটা দিন জুড়েই ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা দিলেন তামিম। এক কথায় নিজের স্বভাবসুলভ ব্যাটিংটাই যেন ভুলে গেলেন। দিনের প্রথম বল থেকে ছিলেন ক্রিজে। খেলে গেছেন শেষ বল অবধি। সব মিলিয়ে সেটা ছয় ঘণ্টারও বেশি সময়। রান এসেছে তাতে ৭৪। ২৫০ বলের ইনিংসে ছিল মাত্র ছয়টি চার।
তামিম ধীর-স্থীর ব্যাটিংয়ে ছাড়িয়ে গেলেন নিজের আগের রেকর্ডকেও। এর আগে তার ক্যারিয়ারের দীর্ঘস্থায়ী ইনিংসটি ছিল ৩১১ মিনিটের। ২০০৯ সালে সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলে করেছিলেন ১২৮ রান। এর আগের নিদর্শনটির ভেন্যু হল মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। গত বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০২ মিনিটে তার ব্যাট থেকে এসেছিল ৭০ রান।
এই নিয়ে ক্যারিয়ারে ১৭ তম হাফ সেঞ্চুরি করে ফেললেন তামিম; জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম। এখানেও আছে নতুন রেকর্ড। হাফ সেঞ্চুরি করতে এবারই সবচেয়ে বেশি বল খেললেন তিনি। ৫০-এ পা রাখতে তিনি মোকাবেলা করেন ১৬৯ বল। আগের রেকর্ডটিও অবশ্য খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেই দ্বিতীয় টেস্টেও দ্বিতীয় ইনিংসে সেন্ট লুসিয়ায় ৫০ করতে তার লাগে ১৪৬ বল।
শুধু দীর্ঘস্থায়ী ইনিংসেই তামিমের মহত্ব বোঝা যাবে না। ডাউন দ্য উইকেটে এসে মিড অনের উপর দিয়ে তুলে মারাই ছিল এতোদিন তামিমের ফেবারিট শট। মাত্র একবারই সেটা করতে দেখা গেল তাকে। তবে, সেটা করতে ব্যর্থ হওয়ার পর আর ও পথে পা বাড়াননি তিনি।
ইনিংসটা দিয়ে অবশ্য অনন্য এক ব্যক্তিগত অর্জনের দিকেই চলে গেলেন তিনি। সেটা হল — প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটে তিনি এখন মালিক হয়ে গেলেন সাত হাজার আন্তর্জাতিক রানের। সব ফরম্যাট মিলিয়ে তামিমের রান এখন ৭০৪০। তার কাছেই আছেন সাকিব আল হাসান। প্রথম দিনে ১৩ রানে অপরাজিত সাকিব ব্যাট করতে নামবেন ৬৮৮৮ রান নিয়ে। তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। তার রান ৬৬৫৫। শুধু কি তাই, টেস্টেও তামিম পৌঁছে গেছেন আড়াই হাজার রানের ক্লাবে। টেস্টে তামিমের আগে আর মাত্র দুজন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান গড়তে পেরেছেন এমন কীর্তি।
দ্বিতীয় দিনে ব্যাট করতে নামার আগে সব কিছু ছাপিয়ে তামিমের নজর অবশ্যই থাকবে সেঞ্চুরির দিকে। সর্বশেষ সেঞ্চুরিটা এসেছিল চার বছরেরও বেশি সময় আগে। সেবার ইংল্যান্ডের মাটিতে পর পর দুটি টেস্টে স্বাগতিকদের বিপক্ষে করেছিলেন সেঞ্চুরি। গ্রীষ্মেও শুরুতে ইংলিশ কন্ডিশনে এমন পারফরম্যান্সের জন্য উইজডেনের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন এই তারকা।
এরপর দীর্ঘ একটা বিরতি। এরপর ৩৩ টা ইনিংসে ৬ টা হাফ সেঞ্চুরি আসলেও আসছে না কেবল তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ২৬ রান দূরে থাকতে তামিমের সামনে অবশ্য অপেক্ষা করছে আরেকটি রেকর্ড। সেটার মালিক আবার তারই ভাই নাফিস ইকবাল। প্রতিপক্ষও এই জিম্বাবুয়ে।
নয় বছর আগে সেবার নাফিস ১০০ তে পৌঁছাতে খেলেছিলেন ৩২৯ বল। নাফিস প্রায় একাই সেই টেস্টে  তামিম তাকে ছুঁতে পারুন আর নাই পারুন ইনিংসটা তামিমের জন্য বড় একটা মাইল ফলকই হয়ে থাকবে।
ব্যাটিংয়ের জন্য তো অবশ্যই তাত্পর্যপূর্ণ দিন ছিল । এর বাইরে ক্রিকেটিয় প্রেক্ষাপটেও দিনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য স্বরনীয়। ঠিক এক বছর আগে এই দিনেই বাংলাদেশ ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে পেয়েছিল হোয়াইট ওয়াশের স্বাদ।
মাঝের এক বছরটা ছিল বিস্বাদের। যেন সব ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করল মুশফিকুর রহিমের দল। এবার এই নবযাত্রাটা দীর্ঘস্থায়ী হলেই হয়!