ঠাকুরগাঁওয়ে ইএসডিও’র উদ্যোগে ব্যতিক্রমী জাদুঘরটি ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে লোকায়ন’কে ঘিরে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। শহর থেকে ৪ কিমি উত্তরে গ্রামীণ নৈসর্গিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে জাদুঘর ‘লোকায়ন’। জাদুঘরে স্থান পেয়েছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন ও তার উপকরণসমূহ।
লোকায়নের চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ শহীদ-উজ-জামান জানান, বাংলাদেশের প্রাচীনতম এ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও রক্তের অনেক স্মারকও ছড়িয়ে রয়েছে। আদিকাল থেকে এ জনপদের মূল চালিকাশক্তি কিষাণ-কিষাণী, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতী, গ্রামীণ কবিয়াল। তাদের উত্পাদন, জীবনযাপন, বিনোদন আর লোকজ ঐতিহ্য স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। প্রচলিত অর্থে জাদুঘর বলতে বিভিন্ন, কাল ও যুগের রাজা-বাদশার বিবরণ। কিন্তু জাদুঘর ‘লোকায়ন’ তার ব্যতিক্রম। ‘লোকায়নে’ রয়েছে কৃষি উপকরণঃ লাঙ্গল, মই, ফলা, দা, কাস্তে, হাতুড়ি, ছাম-গাইন, ডালা, খুন্তি, ধান রাখার ডুবি, ঢেঁকি ইত্যাদি। তাছাড়া আদিকালের দরজা-জানালা, চৌকি, খাট, হুক্কা, চিলিম, বল্লম, বদনা, পাদুকা, থালা-বাটি রয়েছে এখানে। বিনোদনের উপকরণের মধ্যে রয়েছে ঢাক-ঢোল, কাড়া-নাকাড়া, মাদল, মৃদঙ্গ, বাংলাঢোল, আকড়াই, একতারা, দোতরা, সানাই, বাঁশি ইত্যাদি। পালকি, টোপর, ডুলি, মাঙ্গলিক উপকরণ, মঙ্গলসূত্র, চালনি, জায়নামাজ, তসিবহ্, বলির দা, কোরবানির ছুরি, পুঁথি, পাঁচালী, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, পত্রিকা, জমির দলিল, খারিজ, খাজনা আদায়ের রশিদ, একাডেমিক সার্টিফিকেট, মেডেল, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, চিঠি ও আলোকচিত্র ইত্যাদি। ধর্মীয় উপকরণ ও ছাপানো উপকরণ এবং পাণ্ডুলিপি রয়েছে। পুরনো গরু গাড়ি ও চাকা, টাঙ্গা, ঘোড়ার চাবুক, হাতির হাওদা, বিভিন্ন সময়ের ঘড়ি। ধাতব মুদ্রা ছাড়াও লোকায়নে রয়েছে মাটির অলংকার, পরচুলা, ক্লিপ, খোঁপা, নকিশকাঁথা, পুতুল, খেলনা, মাটির তৈরি বাসন-কোসন, বাঁশের ও খড়ের তৈরি পণ্য। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক যেমনঃ বুলেটের খোসা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পোশাক ও চিঠি রয়েছে। জাদুঘরে এমন অনেক পুরনো জিনিস রয়েছে যা বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোররা এসে দেখছে ও শিখছে।
২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দীন খান। এই লোকায়ন জাদুঘরকে ঘিরে সারা বছর এখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল উত্সব, বর্ষা-মঙ্গল উত্সব, মঙ্গা মোকাবেলায় আশ্বিন মাসে মঙ্গা কাল, অগ্রহায়ণে নবান্ন উত্সব, মাঘ মাসে পিঠা উত্সব এবং চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয় ৩ দিনব্যাপী লোকজ মেলা ও কবিগানের উত্সব। শ্রাবণের শেষে এখানে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষা-মঙ্গল উত্সব। উত্সবে শিল্পীরা নানা গান পরিবেশন করেন, আবৃত্তিতে অংশ নেন স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকগণ।
‘লোকায়ন’ জাদুঘর প্রাঙ্গণে ইএসডিও’র উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘শিশুস্বর্গ’। এখানে শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে অবকাঠামো। শহর থেকে দূরে গ্রামের এই ‘শিশুস্বর্গ’ ভবিষ্যতে আরো আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপকরা।