ধোঁয়াশায় পুলিশ মেলেনি ক্লু

শফিউল হত্যা :ঢাকায় বদলি আরএমপি কমিশনার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ক্লু তিন দিনেও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আত্মস্বীকৃত জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে তিনি খুন হয়েছেন না পারিবারিক কোন ঝামেলার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, বিভাগীয় দ্বন্দ্ব না ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা নিষিদ্ধ করা নিয়ে জামায়াত-শিবির সমর্থিত কতিপয় উগ্রবাদী শিক্ষকের বিরোধে তিনি খুন হয়েছেন-এগুলোকে খুনের সম্ভাব্য কারণ ধরে চলছে আলোচনা-গুজব। সংশ্লিষ্টরা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আড়ালে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসাবে যে যার মতো বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন। আর এ কারণেই চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। এর মধ্যেই গতকাল সোমবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আরএমপির কমিশনার ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমানকে রাজশাহী থেকে বদলি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার করা হয়েছে। আরএমপির নতুন কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দিনকে। বদলির আদেশ আসার আগেই গতকাল সকালে আরএমপির কমিশনার (বিদায়ী) ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, শিক্ষক হত্যার ঘটনায় জঙ্গি গোষ্ঠী ছাড়াও তার পারিবারিক ঝামেলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই দিনে অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সংলগ্ন এলাকাকে ঘিরে উগ্রবাদী গোষ্ঠী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। যাদের অভিভাবকের ভূমিকায় রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রায় একডজন শিক্ষক। এদের কয়েকজনের সঙ্গে নিষিদ্ধ জামাআতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রধান শায়খ আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওইসব শিক্ষক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন হত্যার পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে কয়েকজন শিক্ষকের নাম ওঠে আসে। যারা নিজেরা ধর্মীয় উগ্রপন্থায় বিশ্বাস করেন এবং সমমনাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ সংক্রান্ত খবর সেসময় সংবাদপত্রগুলোতে বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়। পত্রিকায় এও আসে যে, তারা অর্থের বিনিময়ে তখন গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন।
সূত্র জানায়, রাজশাহীতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ঘাঁটি খুবই শক্তিশালী। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও তাদের সোর্স রয়েছে। এই ধরনের সহযোগিতা পেয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই গোয়েন্দাদের চেয়েও একধাপ এগিয়ে থাকে। প্রগতিশীল মহলেও তাদের সোর্স কাজ করে। যার কারণে এই সোর্সরাও থাকেন সন্দেহমুক্ত।
সূত্র মতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অভিভাবক ওইসব শিক্ষক প্রকাশ্যে কতিপয় রাজনৈতিক দলের লেবাসে থাকলেও নেপথ্যে ভয়ঙ্কর সব অপকর্মে মদদ দেন। তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানকারীরাই হন পরবর্তীতে টার্গেট। তবে কখনো কখনো তারা মুক্ত ও প্রগতিশীল মতাদর্শের মানুষদেরও টার্গেট করেন। সুযোগ পেলেই শিকারের উপর উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন তারা। আবার অপারেশন সফলের পর মূলঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেন। কিন্তু তারা বরাবরই থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।  এদিকে গত রবিবার দুপুরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স  পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সদরের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সাক্ষাত্কালে তিনি রাজশাহীর সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং একেএম শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন। এসময় তিনি রাবি ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর জঙ্গি তত্পরতা, কিলিং মিশন, বোমা হামলা, রগকাটার রাজনীতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক এবং রাজশাহীর সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা প্রদান করেন বলে জানা গেছে। এ সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজশাহীর সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সাংসদ বাদশাকে আশ্বাস দেন।

এ ব্যাপারে মতিহার থানার ওসি আলমগীর হোসেন এবং গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আবদুল মজিদ গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, এখন পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ক্লু উদ্ধারে তত্পর রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, লালন ও মাজার ভক্তি ছাড়াও ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পড়া নিষিদ্ধ করায় তিনি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর টার্গেট হয়েছিলেন। উদ্ধারকৃত আলামত থেকে এবিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জঙ্গি এবং জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।