বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের বাকেরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বেইলি ব্রিজটির ডেক প্লেট বা স্লিপার এক সপ্তাহ আগে ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহাতে ঝুঁকি নিয়া চলাচল করিতেছে মালবাহী ট্রলি, ট্রাক, যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন। যে কোনো সময় এখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। প্রবাদ আছে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’। এইজন্য দুর্ঘটনা ঘটিবার আগেই বেইলি ব্রিজটি মেরামতের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন ইহার পার্শ্বে চলমান পাকা ব্রিজ নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করা। এক পরিসংখ্যান মতে, দেশে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজের সংখ্যা চার সহস্রাধিক। গতকালই ইত্তেফাকে টাঙ্গাইলের সখীপুর-ভালুকা সড়কের একটি বেইলি ব্রিজের ছবি ছাপা হইয়াছে যাহার লোহার পাটাতন ভাঙিয়া গিয়াছে। এইভাবে বেইলি ব্রিজ নিয়া দুর্ঘটনা ও নানা ঝুঁকির খবর প্রায়শ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হইতে দেখা যায়।
প্রকৃতপক্ষে বেইলি ব্রিজ একটি অস্থায়ী ব্রিজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে এই ধরনের ব্রিজের প্রচলন হয়। ইহার মডেল তৈরি করেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ডোনাল্ড বেইলি এবং তাহার নামেই এই ধরনের ব্রিজের নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশেও বেইলি ব্রিজের ব্যবহার শুরু হয় ব্রিটিশদের হাত ধরিয়াই। তবে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় আমাদের বহু স্থানে ভাঙিয়া যাওয়া সেতু-কালভার্টের স্থলে ব্যাপকহারে বেইলি ব্রিজ স্থাপন করা হয় সাময়িক যোগাযোগ রক্ষা করিবার জন্য। একসময় জাপান ও ভারতের সহায়তায়ও আমাদের দেশে বেইলি ব্রিজ নির্মিত হইতে থাকে। যেহেতু ইহা অস্থায়ী ব্রিজ, তাই স্বাভাবিকভাবে ইহা ভারী যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। তাহার পরও আমাদের দেশে ২০ এমনকি ৪০ টনেরও বেশি ওজনের মালামাল লইয়া যানবাহন ইহার উপর দিয়া চলিতে দেখা যায়। কিছুদিন আগে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ৪০ টন রড বোঝাই একটি ট্রাক বেইলি ব্রিজে উঠিবা মাত্রই তাহা ভাঙিয়া খাদে পড়িয়া যায়। ইহাতে ট্রাকের হেলপারসহ দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। অথচ বেইলি ব্রিজের উপর দিয়া পাঁচ টনের বেশি মালামাল নেওয়াই নিষিদ্ধ। অন্যদিকে আমাদের অধিকাংশ বেইলি ব্রিজই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। তিন হইতে পাঁচ বত্সর অন্তর এইসব ব্রিজ সংস্কার করিবার কথা থাকিলেও তাহা না করা এবং ব্রিজের পাটাতন-প্লেট চুরির কারণেও এইসব ব্রিজ সহজেই দুর্দশায় উপনীত হইতেছে। ইহা যাহাদের দেখিবার কথা, সেই কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙিবে কবে?
বেইলি ব্রিজে রাত্রিকালীন যানবাহন চলাচলের সময় শব্দ হয় বেশি। ফলে আশেপাশের মানুষ ঠিকমত ঘুমাইতে পারেন না। এই বিবেচনায়ও অনেকে এইসব ব্রিজ ব্যবহারের আর পক্ষপাতী নহেন। তাহাছাড়া বাংলাদেশ আজ দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি লাভ করিতেছে। ফলে সড়কে বিভিন্ন যানবাহনের চাপও বাড়িতেছে। এমতাবস্থায় বেশি ওজন ধারণ করিতে পারে এমন স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করাই যুক্তিযুক্ত। প্রধানমন্ত্রী কয়েক বত্সর আগে এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়াছেন। এখন এই ধরনের প্রকল্প বৃদ্ধি ও ইহার কাজ দ্রুত আগাইয়া নেওয়া প্রয়োজন। এখানে একটি সুবিধাজনক বিষয় হইল, আমাদের অধিকাংশ বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হইয়াছে আরসিসি পিলারের উপর। ফলে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণে নূতন ব্রিজের তুলনায় খরচ তুলনামূলক কম হইবে। বিশেষত স্টিলের তৈরি হালকা বেইলি ব্রিজ অধিক দুর্ঘটনাপ্রবণ বলিয়া এইগুলি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত কংক্রিটের ব্রিজে রূপান্তর করা জরুরি।