রাবির অধ্যাপক শফিউল হত্যাকাণ্ড

র‌্যাব ও পুলিশের দুই রকম তথ্য নিয়ে ধোয়াশা

 
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশের দুই রকম তথ্য নিয়ে ধোয়াশা আরো প্রবল হয়েছে। সোমবার চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেফতারকৃত ১১ আসামির মধ্যে আটজনকে দ্বিতীয় দফায় রিমাণ্ডে নিয়েছে। এদিকে বগুড়া থেকে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামে ফেইসবুক পেইজে হত্যার দায় স্বীকার করে দেওয়া পোস্টের সঙ্গে জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যার দায় স্বীকারে জড়িত জঙ্গিদের আরেক মূলহোতাকে পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে।
অন্যদিকে হত্যায় ব্যবহূত চাপাতি তৈরীর সঙ্গে জড়িত কর্মকার সাধনসহ আরো তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। অপরদিকে হত্যাকাণ্ডের পর নিহত অধ্যাপকের একমাত্র ছেলে জঙ্গিদের দায়ী করেন। পুলিশের তদন্ত এখন পর্যন্ত সেদিকেই নির্দেশ করছে। ইতোপূর্বে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে বলছেন, ‘গ্রেফতারদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই হত্যাকাণ্ডে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।’
রবিবার ঢাকায় র্যাব সদর দফতরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আটক ছয় যুবদল নেতাকর্মীকে হাজির করে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদঘাটনের যে দাবি র্যাবের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, তা সমর্থন কিংবা প্রত্যাখান করেনি মামলার তদন্তকারী রাজশাহী মেট্টোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কর্তৃপক্ষ। সোমবার বিকালে আরএমপির সদর দফতরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, ‘‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকালের মোটিভ এখনো উদঘাটিত হয়নি। হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে র্যাবের হাতে আটক ছয়জনের তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হত্যকাণ্ডের পর দায়িত্ব স্বীকার করে ফেইসবুক পেইজে দেওয়া জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ এর দুই সদস্যকে বগুড়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, র্যাব ও পুলিশের হাতে আটকদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকান্ডের কারণ সম্পর্কে আরো পরিস্কার হওয়া যাবে। তদন্তে পাওয়া তথ্য উপাত্ত যাচাই বাছাই করলেই হত্যাকান্ডের মুল রহস্য বেরিয়ে আসবে বলেও জানান পুলিশ কমিশনার। বগুড়া থেকে গ্রেফতারকৃতরা হলেন, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঘাঘুরদুয়ার বেসরকারি ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষক শরিফুল ইসলাম ও বগুড়া সদর এলাকার গোকুল তসলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের অস্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বাধীন (১৪)। তারা দু’জনই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তবে তারা নতুন করে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ এ জড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মূলহোতা এখনো পলাতক। তাকে আমরা আটকের চেষ্টা চালাচ্ছি।’’
তবে রবিবার ঢাকায় র্যাব সদর দফতরে আয়োজিত র্যাব কর্মকর্তারা দাবি করেন, ‘যুবদল নেতা পিন্টুর স্ত্রী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগের সেকশন অফিসারের সঙ্গে ড. শফিউল অসাদাচারণ করেন। অপমানের প্রতিশোধ নিতেই ঐ কর্মকর্তার স্বামী যুবদল নেতা আবদুস সামাদ পিন্টু ও কাটাখালি পৌর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিক অধ্যাপক শফিউলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তাদের দুইজনসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই হত্যায় রাজশাহী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জলের সহযোগিতায় ১১ জন জড়িত। তাদের তিনজনকে রাজশাহী মহানগর পুলিশ আগেই গ্রেফতার করেছে। আরো দুইজন পলাতক রয়েছে। শফিউল হত্যায় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’
আরএমপি কমিশনার বলেন, অধ্যাপক শফিউল হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত চাপাতিটি বগুড়া সদরের আশোকলা গ্রামের কর্মকার সাধন চন্দ্র তৈরী করেছেন। চাপাতির গায়ে কর্মকার সাধন কুমারের নামও লেখা রয়েছে। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাধন কর্মকারসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে।  প্রথম দফায় দুইদিনের রিমান্ডে থাকা ১১ আসামির মধ্যে জিন্নাত আলী, সাগর ও আরিফ এই হত্যকালের সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিত করেছেন আরএমপির কমিশনার। এই তিন আসামিসহ আরো পাঁচজনকে গতকাল সোমবার রাজশাহী মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তৃতীয় আদালতের বিচারক শারমিন আক্তারের আদালতে হাজির করে পুনরায় সাতদিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। শুনানী শেষে বিজ্ঞ বিচারক ৮ জনের প্রথ্যেকের একদিন করে পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অপর পাঁচজন হলো, নগরীর বিনোদপুর ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ন কবির, ওই কলেজের শিক্ষক মোশারফ হোসেন, দুর্গাপুর ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক ফজলুল হক, নগরীর একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সাইফুদ্দিন ও রেজাউল করিম। এছাড়া নগরীর নর্থবেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহামুদ, ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির মালিক মশিউর রহমান ও তাঁর ভাই হাসিবুর রহমানকেও সাতদিনের রিমান্ডে চেয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে আদালত তাদের তিনজনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেননি।
আরএমপির প্রেস ব্রিফিংয়ে ড. শফিউল হত্যায় রাজশাহী জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও যুবদলের জেলা আহবায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে আরএমপির উপ- কমিশনার একেএম নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখনো বিষয়টি তদন্ত করে যাচ্ছি। সব তথ্যই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ছাড়াও যুবদল নেতা আব্দুস সামাদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিরন আক্তার রেশমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকের চেষ্টা চলছে। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।’
প্রসঙ্গত, গত ১৫ নভেম্বর বিকাল ৩টার দিকে নগরীর চৌদ্দপাই এলাকার নিজ ভাড়া বাসার কাছে সন্ত্রাসী হামলায় লালনভক্ত অধ্যাপক শফিউল নিহত হন। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এন্তাজুল হক অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নগরীর মতিহার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।