একটি দেশের অধিকাংশ লোক যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষা রাষ্ট্রীয় সব কাজে ব্যবহূত হয় সেটিকে বলা হয় রাষ্ট্রভাষা। আমাদের রাষ্ট্রভাষা হলো বাংলা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষাগুলোর মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা অন্যরকম। ভাষার জন্য আর কোথাও জীবন দেয়নি কেউ, ভাষার দাবিতে মরণপণ সংগ্রাম আর কোথাও হয়নি। তাই, আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা, প্রিয় বাংলাভাষাকে নিয়ে আমাদের ভালোবাসা ও গর্ব অনেক বেশি। আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। কিন্তু আমরা কি বাংলাভাষার সঠিক ব্যবহার করছি? আমাদের বাংলাভাষার সঙ্গে এখন মিশে গেছে ইংরেজি, হিন্দি, ফার্সী, পর্তুগিজ, উর্দুসহ অনেক ভাষা। এমন এমন বাংলা শব্দ আছে যেগুলো আমরা জানিই না। অনেকেই এখন বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বাংলিশ ভাষায় কথা বলছে এবং গৌরববোধ করছে; যা ভাষা বিকৃতির চূড়ান্ত নজির। এর ফলে বাংলাভাষা বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে যাবে। বাংলাভাষার বিকৃতি রোধ করতে হবে যে-কোনো মূল্যে। পাশাপাশি দেশের সর্বত্র বাংলাভাষার প্রচলন করতে হবে। কেবল একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মধ্যে ভাষাপ্রেম জেগে ওঠে; যার কারণে সারাবছর বাংলাভাষা থাকে উপেক্ষিত। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে বাংলাভাষার অবমাননা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভুলে ভরা সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার। কোথাও বিশুদ্ধ বানানরীতি মানা হচ্ছে না। ভাষা আন্দোলনের ৬২ বছর পরও ভুল বানানের ছড়াছড়ি সর্বত্র। যুগের পর যুগ নানাভাবে এ বিষয়ে কথা উঠলেও বাংলার অবমাননা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এমনকি এ-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশেরও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। রাজধানীর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই নামকরণ করা হয়েছে বিদেশি ভাষায়। কোথাও বিদেশি শব্দ লেখা হয়েছে বাংলায়। আবার কোথাও অহেতুক বাংলা শব্দকে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। আবার কোথাও বা বাংলা-ইংরেজির মিশেল। ফেসবুক থেকে শুরু করে সর্বত্র ইংরেজি বা বাংলার মতো করে ইংরেজি (বাংলিশ) ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষিত ব্যক্তির লিখার মধ্যে দেখা যায় বাংলা বানানে ভুলে ভরা থাকে লেখার বৃহত্ অংশ জুড়ে। অফিস থেকে শুরু করে ছোট ছোট শিশুদের স্কুলেও ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। বাংলাকে অনেকটা অবহেলার চোখে দেখে শহরের আনাচে-কানাচে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিজের নাম ছাড়া অনেক কিছুই বাংলায় বলতে ব্যর্থ হয়। তাদেরকে বাংলা বুঝাতে হলে ইংরেজিতে বলতে হয়। এ চিত্রপুত্তলিকা দেখার জন্য কী ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল? নেই আমাদের কাছে তার কোনো স্পষ্ট উত্তর। বাস্তব অবস্থা এমন যে এসব দেখার যেন কেউ নেই। বাংলাভাষা প্রচলন আইন না মানলে অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু গত ২৮ বছরে কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার নজির নেই। এই আইন ছাড়াও সব সরকারের সময় আদেশ-নির্দেশের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। ভাষা সৈনিকরাই বলছেন, বাংলার ব্যবহার দিন দিন কমছে আর বাড়ছে ভুল বাংলার প্রয়োগ।
সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের নতুন নতুন ভাষা বা শব্দ হালনাগাদ করতে হবে। নতুন ভাষা বা শব্দের সহজ রূপদান করতে হবে। নতুন ভাষা বা শব্দ হালনাগাদ বা সহজ রূপদান করলেই হবে না সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য ভালোভাবে প্রচার-প্রচারণা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া যে সমস্ত শব্দ আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সেগুলো শনাক্ত করে সেগুলোরও সঠিক প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন। দেশের ভিতর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলাভাষার প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের ভাষা শক্তিশালী করতে পারি। দেশের ভিতর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার এক এক ধরনের আঞ্চলিকতা আছে সে সমস্ত আঞ্চলিক ভাষার প্রাধান্য দিতে হবে। তাছাড়া বিভিন্নভাবে সে সমস্ত ভাষার প্রচার করতে হবে। এছাড়া আরো অনেক উপায়ে আমরা আমাদের ভাষা সুসজ্জিত করতে পারি। বাংলাভাষায় উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত শিক্ষার বই প্রকাশে সচেষ্ট হতে হবে। বই পড়া, পাঠাগার আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটানো প্রয়োজন। প্রমিত বাংলা বানানরীতির ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভাষার বিকৃতি এক ধরনের মানসিক ব্যাধি, এ থেকে রক্ষা পেতে রাষ্ট্র-সমাজ, পরিবার ও শিক্ষক, পেশাজীবী সম্প্রদায়ের ভূমিকা ব্যাপক, সর্বোপরি ভাষার প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে আমাদের।
n লেখক:শিক্ষার্থী, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর