২০১৪ সালের আঙ্কটাড এলডিসিজ রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে (এলডিসি) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। উন্নয়ন হলেও উন্নয়নের প্রক্রিয়া দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ চক্র থেকে বের হতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং দক্ষতা ও উত্পাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহি পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান এবং জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। সভায় আঙ্কটাড এলডিসিজ রিপোর্ট-২০১৪ উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জিডিপি (মোট দেশজ উত্পাদন) প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ প্রশংসনীয়ভাবে এগিয়েছে। তবে এমডিজির (সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক ভালো করলেও কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। স্বল্পোন্নত অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেরও কিছু কিছু বিষয় দুষ্ট চক্রে পড়ে গেছে।
বিষয়টি ব্যখ্যা করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রথমত; আমাদের দেশজ আয়ে কৃষির অবদান কমলেও কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান কমেনি। এর কারণ হলো কৃষি শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান বাড়লেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শিল্পের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। দ্বিতীয়ত; রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখীকরণ হয়নি। এক সময় আমাদের পাট, চামড়া ও হিমায়িত খাদ্যের অবদান অনেক বেশি ছিল। এখন এ খাতগুলোর অবদান কম। তৃতীয়ত; শ্রম ও পুঁজির উত্পাদনশীলতার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এজন্য শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলকভাবে কম। পুঁজির উত্পাদনশীলতা কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ অনেক বেশি। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।
এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার ব্যাপারে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কিছু কিছু দেশ প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করে এগিয়ে গেছে। আয় ও কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে। কিন্তু তারা সামাজিক সূচকে এগুতে পারেনি। কারণ তাদের কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। কাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারলে টেকসইভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। বিশেষায়িত কোন খাতে (যেমন পর্যটন) উন্নয়ন করেও এলডিসি থেকে বের হয়ে আসার শর্তগুলো পূরণ করা যেতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি থেকে বের হতে তিনটি সূচকে উন্নতি করতে হয়। আয় সূচক, ভঙ্গুরতা সূচক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচক। বাংলাদেশের যেহেতু অনেক জনগণ। তাই আয়ের সূচকে উন্নতি করা কঠিন। তবে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অনেকে আমাদের দেশকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার দিকেই বেশি মনযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হওয়া মানেই এলডিসি থেকে বের হওয়া নয়। তাই এলডিসি থেকে কিভাবে বের হতে পারবো সেদিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশ কবে নাগাদ এলডিসি থেকে বের হতে পারবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শর্তগুলোতে মাঝে মাঝে কিছু পরিবর্তন আসে। তাছাড়া শর্ত পূরণ হলেও তা টেকসই হয় কিনা সেজন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। তবে সব মিলিয়ে উচ্চ আশা নিয়ে বলা যায়, আগামী এক দশকের মধ্যে এলডিসি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারে। মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছাতে এত সময় লাগবে না।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে ৪৮টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় আছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার তিনটি শর্তের মধ্যে দুটি সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো।