ইসলাম ধর্ম প্রচারক ও বিখ্যাত সুফী দরবেশ হযরত শাহজালাল (র.) এর পুণ্যভূমি সিলেটে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও দেশের বাইরে থেকে অগণিত ভক্ত আসেন এই মহান সাধককে শ্রদ্ধা জানাতে। বিভিন্ন বয়সের, নানা শ্রেণী পেশার অসংখ্য মানুষের আগমনে মুখর থাকে মাজার এলাকা। সব ধর্মের মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধার তিনি। সিটি করপোরেশনের এক নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত শাহজালাল (র.) এর মাজার। এই মাজারের কারণে এই এক নম্বর ওয়ার্ডের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
এলাকাবাসী ও ভক্তদের দাবি, মাজার সংলগ্ন সড়কগুলো আরো প্রশস্ত করা হোক। সড়ক সরু হওয়ায় প্রায়ই যানবাহনের জট লেগে থাকে। সাধারণ মানুষের মাজারে প্রবেশে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সড়ক প্রশস্ত করা হলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন নির্বিঘ্নে মাজার জিয়ারত করতে পারবে। এছাড়া সড়কগুলো যানজটমুক্ত দেখতে চান এলাকাবাসী। মানুষজনের ভোগান্তি কমাতে এখানে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন তারা।
২০০২ সালে সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগেও এই ওয়ার্ডটিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এ ব্যাপারে ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ তৌফিকুল হাদী বলেন,‘উন্নয়ন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমি ২০০৩-২০১৩ সাল পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে প্রায় ১৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছি। চেষ্টা আছে আরো উন্নয়ন করার।’
২০১৩ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর বর্তমান কর্তৃপক্ষ নগরীর স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এই ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে। তবে মশার উপদ্রব ও বিশুদ্ধ পানির সংকট লেগে আছে আগের মতোই। এই ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানের ফুটপাতগুলো মানুষের হাঁটাচলার অনুপযোগী। ফুটপাতগুলোর ভগ্নদশা, এবড়ো-থেবড়ো। বিশেষ করে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন ভিআইপি সড়কের পাশে যে ড্রেন করা হয়েছে তার উপর লাগানো সিরামিক ইটগুলো খসে পড়ছে। আর সেগুলো চুরিও হয়ে যাচ্ছে। চৌহাট্টা থেকে মুসলিম সাহিত্য সংসদের পর আম্বরখানা পয়েন্ট পর্যন্ত ফুটপাতের অবস্থার উন্নতি নেই। দরগাবাজার ফুটপাতেরও একই অবস্থা। দর্শনদেউড়ী থেকে মাজারের ঝর্ণা পর্যন্ত সড়কটি সরু, তাই সড়কে সারাক্ষণ জ্যাম লেগেই থাকে।
ওয়ার্ডের উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হচ্ছে দরগা মহল্লা, ঝর্ণারপাড়, দর্শনদেউড়ী, রাজার গলি, মীরের ময়দান, আম্বরখানা পশ্চিম, মিয়া ফাজিলচিশত ও চৌহাট্টা। এই ওয়ার্ডের ভোটার সাড়ে ৮ হাজার। লোক সংখ্যা ৩০ হাজার ।
উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র, সিলেট প্রেসক্লাব কার্যালয়, সিভিল সার্জন কার্যালয়, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মৃত্তিকা উন্নয়ন অফিস, পুরাতন মেডিক্যাল কলোনি, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, দরগাহ মাদ্রাসা, কমার্স কলেজ, ওসমানী মেডিক্যাল উচ্চ বিদ্যালয়, জালালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফরেস্ট হিল বিদ্যালয়। এছাড়াও এই ওয়ার্ডে ৬টি মসজিদ রয়েছে।
পায়রা সমাজ কল্যাণ সংস্থার সাহিত্য সম্পাদক রাজিব চৌধুরী বলেন, আমরা এই ওয়ার্ডটিকে আরো টিপটপ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে দেখতে চাই।
এদিকে, দর্শনদেউড়ী ব্রিজ, চৌহাট্টা, দরগা গেইট, দরগা গোরস্থানের পাশের রাস্তা ও মীরের ময়দানে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে জানান এলাকাবাসী। তারা বলেন, ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেট থাকে মাজারের দর্শনার্থীরা। এলাকায় পুলিশ টহল বাড়ানো ও একটি অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছেন এলাকার লোকজন।
সৈয়দ তৌফিকুল হাদী ইত্তেফাককে বলেন, মিনার রোড প্রশস্ত করা হচ্ছে। মাদার কেয়ার ক্লিনিক থেকে মীরের ময়দান পর্যন্ত ৩৬৮ মিটার ড্রেনের ওপর স্লাব দিয়ে একটি বাইপাস রাস্তা করা হচ্ছে। এর কাজ শেষ হলে এলাকার জ্যাম থাকবে না। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, শিগগিরই এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ডিপ টিউবওয়েল বসানো হবে।
মাজার কমিটির সেক্রেটারি সামুন মাহমুদ খান বলেন, ‘এক নম্বর ওয়ার্ডে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার অবস্থিত হওয়ায় এলাকাটি মর্যাদাপূর্ণ। এই ধারাবাহিকতায় এই ওয়ার্ড একদিন আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।’
এ প্রসঙ্গে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কোন স্থাপনার নামকরণ করেন ‘শাহজালাল’ নামে। অনেক সময় তারা ওলিদের নামটি সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করেন না।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর আতাউর রহমান পীর হযরত শাহজালাল (র.) এর নামে যে কোন ধরনের স্থাপনার বিপক্ষে। তিনি এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলেন, অনেক সময় মানুষ অসতর্কতার কারণে যেনতেনভাবে নামটি উচ্চারণ করে থাকে। এতে ওই ব্যক্তির অমর্যাদা হয়। একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী।