স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানা বিতর্ক আর সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মপরিচয়ের সংকটের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে-এমন অভিযোগের বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজ রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পরির্দশনে যাওয়ার কথা। তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সরজমিনে দেখার ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসাবেই এ মন্ত্রণালয়ে আজ যাচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সকল প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া উপহার দেয়ার কর্মসূচি বাদ দিতে হয়েছে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের আপত্তির কারণে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কি কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়েছে তারও একটি ফিরিস্তি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যদিও ওই ফিরিস্তি পড়ে প্রধানমন্ত্রী জানতে পারবেন না গত কয়েক দশকে কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কিত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে, কীভাবে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে, বারবার সংজ্ঞা পাল্টিয়ে কীভাবে অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। কারণ এসবের কোন তথ্যই প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুত উপস্থাপনপত্রে উল্লেখ নেই।
অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোরশেদ খান বলেন, ‘কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় জানেন। আজ রাজাকারের তালিকা করার কথা। কারণ সামান্য কয়েক লাখ মানুষ ছাড়া সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা তেমন নেই। এটি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব হতো না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো সম্পর্কে এক সার-সংক্ষেপে লিখেছিলেন ‘হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-জীবীকার ব্যবস্থা করতে হবে’। এ ছাড়া ওই সারসংক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব বাদ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক সম্মানি ভাতা পাঁচ হাজার টাকা দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। মন্ত্রণালয় এই ভাতা তিন হাজারের প্রস্তাব করেছিল।
মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন সিকদার বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গঠিত মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ চিন্তা করে না। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। তার মতে শেখ হাসিনা ছাড়া তাদের দেখার কেউ নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবিকার জন্য বিশেষ উদ্যোগ না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। যদিও মন্ত্রণালয়ের ফিরিস্তিপত্রে এ ধরনের মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করে ভাতা দেয়া হয় বলে উল্লেখ আছে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য উপস্থাপিত পত্রে ৩২৮ ব্যক্তি ও সংগঠনকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা ও মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রি সম্মাননা দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু এ নিয়ে যেসব কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে- প্রধানমন্ত্রীর কাছে মন্ত্রণালয়ের জবাব কি সেটিও জানানো দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ২০০৯-২০১৪ সালে কি প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা করা হয়েছে সেটির তথ্য নেই ওইপত্রে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত যেসব অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে তারও কোন ফিরিস্তি নেই।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দেয়া টাকা কীভাবে মন্ত্রণালয় স্বেচ্ছাধীন ব্যয়ের মাধ্যমে নয়ছয় করেছে তা প্রধানমন্ত্রীকে জানানো উচিত। গণকর্মচারী মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বাড়ানোর বিষয় নিয়ে কীভাবে দুই চারজনের জন্য সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাকে লজ্জায় ডোবানো হয়েছে। একজন গণকর্মচারী এই প্রসঙ্গে বলেন, শুধু চাকরিকালে ঘোষণা না দেয়ায় কাউকে অমুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দেয়া যায় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পর যারা বেসরকারি কর্মে নিয়োজিত ছিলেন তারা সরাসরি কর্মে আত্মীকৃত হয়েছেন। আত্মীকৃত হওয়ার কোন ফরম ছিল ন। আবেদনেও মুক্তিযোদ্ধা কী-না সেটি উল্লেখের বিধান নেই। তাহলে কী এসব গণকর্মচারী মুক্তিযোদ্ধা হলেও ঘোষণা না দেয়ার সুযোগ না থাকায় তাকে অমুক্তিযোদ্ধা বলে আখ্যা দেয়া যাবে? তিনি বলেন, এটি একটি গুরুতর সমস্যা। এর সমাধান জরুরি।
১৯৭২ সালের আদেশে মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোন সংগঠিত দল (ফোর্স) -এর সদস্য হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত কোন সংগঠিত দলের সদস্য না হন এবং হয়েও যদি সক্রিয় ভূমিকা না রাখেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পড়বেন না। এরপরেও এক এক সময় এক ধরনের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত সময়ে সংসদীয় কমিটি এবং গঠিত একটি সাব-কমিটি পাঁচ বছর ধরে বৈঠকের পর বৈঠক করেছেন; কিন্তু ৭২-এর বাইরে গিয়ে পরিবর্তিত সংজ্ঞা করতে পারেননি। এখন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি নতুন এক সংজ্ঞার উদ্ভাবন করেছেন। এই সংজ্ঞা অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত সবকাজকর্ম বন্ধ। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ভিত্তিতে ভাতা বন্ধের কারণে হয়রানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। পাঁচ দফা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধারা কার্যত মুখোমুখি।