ঢাকা থেকে দুবাইগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড়োজাহাজ ছিনতাইকারী কথিত মাহাদীর পরিচয় মিলেছে। একই সঙ্গে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার নাম মাহমুদ পলাশ (২৪)। সে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামের পিয়ার জাহানের ছেলে। সাত বছর আগে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণের মামলায় ২০ দিন কারাগারে ছিলেন। র্যাবের অপরাধীর তালিকাও রয়েছেন পলাশ। নায়িকা সিমলা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে কমান্ডো অভিযানে নিহত হন পলাশ।
জানা যায়, ২০১২ সালের দিকে সে স্থানীয় তাহিরপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে। এরপর সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। পলাশের বাবা ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশে থাকতেন। প্রথমে কুয়েত এবং পরে সৌদি আরবে ছিলেন তিনি। প্রবাসী বাবার দেওয়া টাকা-পয়সা নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন পলাশ। এর মধ্যে নাচগান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিল্পে জড়ান তিনি। কয়েকটি শর্টফিল্মও তৈরি করেন বলে জানায় পরিবার। একটা সময় বাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন পলাশ। বাড়িতে তেমন যেতেন না। মাঝে মধ্যে টাকার প্রয়োজন হলে বাড়ি যেতেন। পলাশের বাবা গত সাত বছর আগে বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে দেশে চলে আসেন। এলাকায় একটি মুদি দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। পলাশরা চার ভাইবোন। তারা তিন বোন এবং এক ভাই। মা রেনু আক্তার গৃহিণী। পলাশের বাবা বলেন, গত ২০-২৫ দিন আগে বাড়িতে আসে পলাশ। সাধারণত বাড়িতে সে এত দিন থাকতো না। গত ২০-২৫ দিনে অনেকটা পাল্টে যায় সে। মসজিদে যাওয়া-আসা করে, এমনকি আজানও দিয়েছে। তিনি জানান, গত শুক্রবার বাসা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তার মাকে বলে যায়- ভ্রমণ ভিসায় আমি দুবাই যাচ্ছি। তবে দুবাই যাওয়ার বিষয়ে বাবাকে কিছু বলেননি পলাশ।
পলাশের বাবা বলেন, ছেলের উচ্ছৃঙ্খল জীবন নিয়ে তিনি এতটাই অতিষ্ঠ ছিলেন যে, তিনি চেয়েছেন- হয় ছেলে ভালো হোক, না হয় মারা যাক। পিয়ার জাহান বলেন, তার ছেলে ‘বেয়াড়া’ স্বভাবের ছিলেন। দুবাই যাওয়ার কথা বলে গত শুক্রবার বাড়ি ছাড়েন পলাশ। পিয়ার জাহান জানান, গত কোরবানি ঈদের এক মাস আগে এবং এরপর এক সপ্তাহ আগে দুই দফায় পলাশ বাড়ি আসেন। তখন তার সঙ্গে চলচ্চিত্র নায়িকা সিমলা ছিলেন বলে দাবি করেন পলাশের বাবা। তিনি বলেন, পলাশ তাকে জানান, সিমলাকে তিনি বিয়ে করেছেন। তবে পলাশের এই বিয়েতে প্রবল আপত্তি করেন তারা। এ কারণে যেদিন এসেছিলেন, ওই দিনই সিমলা ও পলাশ ঢাকায় চলে যান। পলাশের জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল না বলে জানান পলাশের বাবা। নাম মো. পলাশ আহমদ হলেও ফেসবুকে মাহি বি জাহান নামে অ্যাকাউন্ট আছে তার। ওই অ্যাকাউন্টে দেওয়া ছবিগুলোও বাবা পিয়ার জাহান শনাক্ত করেন। পলাশের মা রেণু বেগম রবিবারই হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসেছেন। তার স্ট্রোক হয়েছিল। বাড়ি এসে ছেলের কথা শোনার পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা। নিহত পলাশের লাশ এখন ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মর্গে আছে। তবে ছেলের লাশ চান না বাবা। বললেন, ‘দেশের বিরুদ্ধে যে কাজ করেছে, তার লাশ চাই না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিয়ার জাহান বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে ও একমাত্র ছেলে পলাশ। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আরেক মেয়ে ছোট (৪)। রবিবার রাতে সোনারগাঁও থানা থেকে পুলিশ বাড়িতে এসে ছবি দেখালে আমরা জানতে পারি, পলাশ বিমান ছিনতাই করতে গিয়ে নিহত হয়েছে।’ পিয়ার জাহান ১৯৯০ সালে কাজের উদ্দেশে ইরাকে যান। সেখানে চার বছর কাটানোর পর দেশে ফিরে আবার সৌদি আরব যান। সেখান থেকে ২০১২ সালে দেশে এসে এলাকায় মুদির ব্যবসা শুরু করেন।
রবিবার রাতে সোনারগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ পলাশের বাসায় এসে একটি ছবি দেখিয়ে তার বাবাকে বলেন- এটা আপনার ছেলে কিনা। এসআই আবুল কালাম বলেন, ‘পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে একটি তথ্য আসে যে মেহেদী বা মাহাদী হাসান নামের বা এ ধরনের কেউ দুবাই যাবে এমন কেউ সোনারগাঁয়ে আছে কিনা। পাশাপাশি মৃতদেহের একটি ছবি পাঠানো হয়েছিল। ওই ছবি নিয়ে তিনি রাতে পলাশদের বাড়িতে গেলে তার পরিবার পরিচয় নিশ্চিত করে।’ ছবি দেখে এবং দুবাই যাওয়ার বিষয়টি মিলিয়ে পরিবার নিশ্চিত হয় নিহত ব্যক্তি মাহমুদ পলাশ। প্রঙ্গগত, ঢাকা থেকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড়োজাহাজ রবিবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিল। প্রায় দুই ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি ছিনতাই চেষ্টার অবসান হয়। কমান্ডো অভিযানে উড়োজাহাজে থাকা অস্ত্রধারী তরুণ নিহত হন। টিকিটে তার নাম মো. মাজিদুল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। এর আগে উড়োজাহাজটি থেকে যাত্রী-ক্রুসহ সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় বিমানবন্দর এলাকায় ভিড় করে অসংখ্য মানুষ। এ ঘটনায় সাতটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রাত ১০টার দিকে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এদিকে ‘চিত্রনায়িকা প্রেমিকার কারণে বিমান ছিনতাই’ এরকম একটি খবরের চর্চা হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়া ও সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। আলোচনায় চিত্রনায়িকা হিসেবে যার নাম এসেছে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা ‘সিমলা’। বলা হচ্ছে প্রেমিকা সিমলার সঙ্গে মনোমালিন্যের জের ধরে হতাশ হয়ে অস্ত্রসহ বিমান ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন মাহমুদ পলাশ নামের এই যুবক। তবে তার ফেসবুক প্রোফাইলের নাম মাহিবি জাহান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহিবি জাহান মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রথম তিনি ‘কবর’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি এতে অভিনয়ও করেন। আর তার সেই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন রাশিদ পলাশ। ২০১৪ সালে পলাশ বগুড়া সদর উপজেলার সাতমাথা ভাইপাগলা মাজার সংলগ্ন স্থানীয় এক আইনজীবীর মেয়েকে বিয়ে করেন। পলাশ-মেঘলা দম্পতির আড়াই বছর বয়সী আয়ান নামে এক ছেলেও রয়েছে। পরে স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এরপর ঢাকায় সিনেমার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া চিত্রনায়িকা সিমলাকে বিয়ে করেন।
সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দেলোয়ার নামে এক ব্যক্তি তার মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে পলাশ ওরফে মাহাদীর নামে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৪৪। ওই বছরের ২৮ মার্চ র্যাব তাকে গ্রেফতারের পর অপহূত কিশোরীকে উদ্ধার করে। এ সময় নেমরা মারমা নামে পলাশের এক সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। র্যাবের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া ) মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘আমরা তার প্রিভিয়াস ক্রিমিনাল রেকর্ড খতিয়ে দেখছি।’ র্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, অপহরণের ওই ঘটনায় পলাশ আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল বলে ভিকটিমের পরিবার তখন অভিযোগ করে। পরে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ভিকটিমকে উদ্ধার এবং এক সহযোগীসহ পলাশকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে, পলাশের বাবা পিয়ার জাহান সরদার বলেন, ‘এক মেয়ের সঙ্গে পলাশের ভালোবাসা ছিল। ওই মেয়ের বাবা মামলা করেছিল। সেই মামলায় পলাশ ২০ দিন কারাগারে ছিল। পরে জামিন করাই।’ পলাশের বাবা বলেন, ‘আমার একটাই ছেলে। আমরা ওই মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি ছিলাম। কিন্তু মেয়ের বাবা রাজি হয় নাই। পরে আপসের মাধ্যমে তারা মামলাটা তুলে নিছে।’
অপরদিকে বিমান ছিনতাই করতে গিয়ে যে যুবক কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়েছেন, তার আঙুলের ছাপ ক্রিমিনাল ডেটাবেইজে থাকা এক অপরাধীর সঙ্গে মিলে গেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সোমবার বলেন, তাদের ডেটাবেইজের তথ্য অনুযায়ী ওই যুবকের নাম মো. পলাশ আহমেদ। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের দুধঘাটা এলাকার পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে তিনি।