শিল্প-সংস্কৃতি, ব্যবস্যা-বাণিজ্য, কৃষি, আচার-অনুষ্ঠান— সবকিছুতেই অগ্রসরমান জনপদ বগুড়া। আর এই অগ্রসরতার পেছনে আড়াই হাজার বছর পূর্বের মহাস্থান গড়ের (পন্ড্রুবর্ধন) সভ্যতা আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করছে। মহাস্থান গড় ও এর পার্শ্ববর্তী ৮/১০ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন আমলের অসংখ্য নিদর্শন।
জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে গত ২ বছরে মহাস্থানগড়ের বৈরাগীর ভিটা খননকালে যে সমস্ত নিদর্শন (পুরাকৃর্তি) উদ্ধার করা হয় তার মধ্যে রয়েছে পোড়ামাটির গুটিকা, টিসি বল, পোড়ামাটির ফলক, পাথরের গুটিকা, পোড়ামাটির জালের গুটিকা, অলংকৃত ইট, পোড়ামাটির ছোট পাত্র, পোড়ামাটির কালির দোয়াত, কাচের গুটিকা, উত্তরাঞ্চলীয় চকচকে কালো মৃত্ পাত্রের টুকরাসহ উল্লেযোগ্য সংখ্যক বিভিন্ন রংয়ের মৃত্ পাত্রের টুকরা। এ সমস্ত নিদর্শন কার্বন ডেটিং ও গবেষণা কার্যক্রমের জন্য এখনো জাদুঘরে প্রদর্শন করা হয়নি।
মহাস্থানগড়ের বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন পন্ড্রুবর্ধন ভূমির রাজধানী পন্ড্রুনগরের সুদীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এই ধ্বংসাবশেষ বগুড়া শহর থেকে ১৩ কিরোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। সারা বাংলার সর্বপ্রাচীন এই দুর্গনগরী পর্যায়ক্রমে মাটি ও ইটের বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এই স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকদের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাগণের রাজধানী ছিল।
১৯২৮-২৯ সালে মহাস্থানগড়ে সর্বপ্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ শুরু হয়। এই সময় নগরীর মধ্যে বৈরাগীর ভিটা, মুনীর ঘোন ও বাইরে গোবিন্দ ভিটা নামক টিনটি স্থানে খনন করা হয়। এর দীর্ঘদিন পর ১৯৬০-৬১ সালে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ আমলে ১৯৮৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে দুর্গের বিভিন্ন অংশে খনন করা হচ্ছে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব দুর্গ প্রাচীরের মধ্যবর্তী এলাকায় খনন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২ হাজার সাল থেকে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কাজ করা হচ্ছে। ১৮টি স্তরে প্রাক-মৌর্য, মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও মুসলিম যুগের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, রাস্তা, নর্দমা-নালা, কূপ, মন্দির, মসজিদ, তোরণ, বুরুজ ইত্যাদি উন্মোচিত হয়েছে। এসব স্থাবর স্থাপত্যিক কাঠামো ছাড়াও আবিষ্কৃত হয়েছে তদানিন্তন নগর জীবনের বিভিন্ন অস্থাবর সাংস্কৃতিক দ্রব্যাদি। উদ্ধারকৃত এসব নিদর্শন মহাস্থান প্রত্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরের কাষ্টোডিয়ান মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী জাদুঘর পরিদর্শনে আসেন। ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় আরো বেড়ে যায়। গত বছর জাদুঘরের টিকিট বিক্রি থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, মহাস্থানগড় ইতিহাসের এক বিস্ময়। এটাকে ওর্য়াল্ড হেরিটেজে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে বিশেষজ্ঞরা প্রতি বছর এখানে খনন কাজ পরিচালনা করছেন। খননের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত নিদর্শন থেকে বাংলার সমৃদ্ধ অতীতকে নতুন করে জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে।