ছিটমহলের বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ জীবন-জীবিকা

এলাকায় কোন স্কুল না থাকায় ছেলে-মেয়েরা হচ্ছে নিরক্ষর। অল্প কিছু ছেলে-মেয়ে পরিচয় গোপন রেখে বাংলাদেশের স্কুলে পড়ছে। চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত তারা

পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া সড়কের পৌনে এক কিলোমিটার সড়ক ভারতের ছিটমহল পুঁটিমারীর মধ্যে পড়েছে। এই সড়ক দিয়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য বোঝাই ট্রাক যাতায়াত করে।
সড়কটির উন্নয়ন পঞ্চগড় এলজিইডি করে থাকলেও কাগজে-কলমে বাংলাদেশের পক্ষে ঐ পৌনে এক কিলোমিটার সড়কের মালিকানা নেই। এই সড়কের দুই পাশে ভারতের ছিটমহল পুঁটিমারীর অবস্থান। ১২২ একর জমি নিয়ে এই গ্রাম। ৩৪০ জন এই গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামের বাসিন্দা চন্দ্র বর্মন বলেন, ৮৪ বছরের এই বয়সে তিনি ব্রিটিশ, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের আমল দেখছেন। এলাকার মানুষের কোন সুযোগ-সুবিধার কোন ব্যবস্থা নেই। ‘এক ঘরে’ এই জীবনে তাদের বেঁচে থাকা এখন দায় হয়ে গেছে। জ্ঞানের আলো বিকশিত করতে কোন স্কুল নেই গ্রামে। প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। বাকি ১০ ভাগ মানুষ নাম পরিচয় গোপন রেখে পাশের বাংলাদেশের গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেছেন। গ্রামের একজন মানুষও চাকরি করেন না।
মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই পুঁটিমারী ছিটমহলবাসী তাদের নাগরিক পরিচয় পেতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কাগজে-কলমে ভারতের হলেও তারা ভারতে যেতে পারেন না। কারণ গ্রামটির চারদিকে বাংলাদেশের গাইঘাটা, ধনীপাড়া, মাগুড়াপাড়া, মনিরামপুর জোড় ও সোনাপাড়া গ্রামের অবস্থান। এ কারণে তাদের যাতায়াত হয়ে থাকে বাংলাদেশের সাথে। নাম পরিচয় গোপন রেখে তাদেরকে বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে ওঠা-বসা করতে হয়। ছিটমহলের এই বাসিন্দারা এক ধরনের অবরুদ্ধ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। এলাকায় নেই কোন চিকিত্সা সেবা কেন্দ্র। নেই বিদ্যুতের সংযোগ।  তারা শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে আছেন।  
পুঁটিমারী ছিটমহলের ফাতেমা বেগম বলেন, তার ইচ্ছা ছিল দুই সন্তান ফেরদৌস ও গোলাপকে লেখাপড়া করানোর। নিজে নিরক্ষর হয়েও সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার ইচ্ছা তার পূরণ হয়নি। স্কুল নেই বলে তার তিন সন্তানের পড়াশোনা হয়নি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘হামার আর জীবনত কিইব্যা হইবে। শুনছি এই গ্রাম নাকি বাংলাদেশের হবার লাগছে। তাইলে এইবার হামার উদ্ধার হবার লাগছে’। তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে বলেন, একদিন পেটে মারাত্মক ব্যথা অনুভব করলে লোকজন তাকে বাংলাদেশের একটি বাজারের ওষুধের দোকানে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে ভারতীয় বলে কেউ তার কাছে ওষুধ বিক্রি করতে চাননি। পরে তাকে নিয়ে পঞ্চগড়ে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। ক্লিনিকের খাতায় তাকে বাংলাদেশি হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এলাকায় কোন চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই বলে গ্রামবাসীরা ছদ্মনামে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশে চিকিত্সা সেবা নেন।
ছিটমহলের শেষদিকে পাশাপাশি দুটি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন জয়গুন ও বানু। জয়গুনের দুই ছেলে। ভিটেমাটি ছাড়া তার কিছুই নেই। জয়গুনের স্বামী দিনমজুর। গতকাল জয়গুনের সাথে কথা হয় এই দুই প্রতিবেদকের। দিনমজুরি করে সংসার কোন রকমে চালাচ্ছেন জয়গুনের স্বামী। দুই সন্তানকে কোন লেখাপড়া করাতে পারেননি। ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দা বলে পঞ্চগড় শহরে জয়গুনের স্বামী পরিচয় গোপন রেখে দিনমজুরি করেন।     
পুঁটিমারী ছিটমহলের পঞ্চাশোর্ধ্ব তসলিম উদ্দিনের কাছে তার নাগরিকত্বের পরিচয় জানার জন্য প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাইরে সুন্দরবনের বাঘের শুমারি হয়। আর হামার ছিটমহলের মানুষ গণনা হয় না। হামরা মানুষ পশুর চায়াও নিকৃষ্ট।’ তছলিম উদ্দিনকে পুঁটিমারীবাসী চেয়ারম্যান হিসাবে মনোনীত করেছেন। এখানে কোন ভোট দেয়ার ব্যবস্থা নেই। এলাকার কেউ সমস্যায় পড়লে ছুটে আসেন তসলিম উদ্দিনের কাছে। আর তসলিম উদ্দিন অনেকটা ইউপি চেয়ারম্যানের মতো দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে সমস্যার সমাধান করে দেন।
এলাকার কেউ জমি বিক্রি করতে চাইলে, এই চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিক্রি করতে হয়। চেয়ারম্যানের তৈরি করা কাগজপত্রে স্বাক্ষরের মাধ্যমে জমি বিক্রির কাজটি সম্পন্ন হয়। জমি বিক্রির এই কাগজ আবার পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার হলদিবাড়ি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিতে হয়।
এই ছিটমহল থেকে ভারতের জলপাইগুড়ি, মৌচাগজ, গোয়ালগজ ও চান্দাপাড়ার অবস্থান ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার। ভারতের এই এলাকায় পুঁটিমারীবাসীদের কেউ ভারতীয় বলে পরিচয় দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিএসএফ বাধা দেয় বলে অভিযোগ করা হয়। ফলে তারা বাংলাদেশে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে যাতায়াত করেন ।
পুঁটিমারী ছিটমহলের মানুষ দারিদ্র্য সীমার অনেক নিচে অবস্থান করছেন। সামান্য চাষযোগ্য জমিতে বংশ পরম্পরায় কৃষিকাজ করে মাত্র এক বেলা ভাত জোটে। গ্রামের গোবিন্দ চন্দ্র বর্মন, চিলকা বর্মন, সুভাস, গোলাম হোসেন, আছিরুল, মফিজুল, সুপেন, হাবিবুর, হবিবর, করিম, ওসমান গনি, মফিজুলসহ অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয়। এদের সবারই এক কথা, তারা ‘আর বদ্ধ জীবনে থাকতে চান না। তারা এখন নিজেদের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চান। সেই পরিচয় পাওয়ার জন্য তারা অপেক্ষা করে আছেন।
পুঁটিমারী ছিটমহলে বাংলাদেশের পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের লাইনের খুঁটি রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে এই ছিটমহলে কোন বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়নি। এলাকার আফাজউদ্দিন জানালেন, তাদের গ্রাম দিয়ে বিদ্যুত্ লাইন গেলেও শুধু ছিটমহল হওয়ার কারণে কোন বাড়িতে বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়নি। ১০ কিলোমিটার দূরে ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে এই গ্রামে বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়াও সম্ভব নয়। পাশের বাংলাদেশের গ্রামে বিদ্যুত্ সংযোগ থাকলেও তাদের দেখা ছাড়া এই সুফল ভোগ করার কোন অধিকার নেই। 
বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬১ টি ছিটমহল আছে। এদের মধ্যে ভারতের ছিটমহল ১১১টি। লালমনিরহাটে ৫৯ টি, পঞ্চগড়ে ৩৬ টি, কুড়িগ্রামে ১২ ও নীলফামারীতে চারটি ভারতের ছিটমহলের অবস্থান। বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। ছিটমহল নিয়ে আন্দোলন করতে গঠিত হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি।

এই কমিটির সভাপতি মফিজার রহমান বলেন, দেশভাগের পর ৬৬ বছর ধরে ১৬১ টি ছিটমহলের জনগণ তাদের নাগরিকত্বের পরিচয়ের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। এখন সময় এসেছে তাদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করার। দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হলেই তাদের সেই নাগরিকত্বের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতের ১১১টি ছিটমহলের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বাংলাদেশের জমির মালিকানা ও নাগরিকত্বের পরিচয় চান।