‘আমি বীরাঙ্গনার মেয়ে, আমি বাংলাদেশের মেয়ে’




 
এক.
ভ্যাঙ্কুভার বিশ্বের সেরা শহরের শীর্ষে। তাই কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারকে বলা হয় ভূস্বর্গ! ভূস্বর্গ থেকে নেমে আসা বিশ্বের অন্যতম নোংরা শহর ঢাকাকে মনোয়ারার কিছুতেই ‘নরক’ মনে হচ্ছে না। বরং প্রতি মুহূর্তেই এই শহর, এই দেশ, এই দেশের মানুষগুলোকে তার আরও আপন, আরও কাছের স্বজন মনে হচ্ছে। এতদিন সাদা স্রোতের বিপরীতে ছিল, আজ যেন নিজের বাদামি স্রোতে মিশে গেছে মনোয়ারা। মুগ্ধ হয়ে দেখছে—নানা ধরনের মানুষ। মানুষের আচার-আচরণ, মানুষের ভিড়-ব্যস্ততা, মানুষের ভালোবাসা-কষ্ট। জটিল জ্যাম। ট্রাফিকবিহীন রিকশা-গাড়ির ধাক্কাধাক্কি। উদ্ভট হর্নের চিত্কার! শিকড়ের সন্ধানে এসে মনোয়ারার কীসের এক টানে কোথায় যেন কী গেঁথে যাচ্ছে। বুকের ভেতর কী যেন কী আটকে যাচ্ছে, টের পাচ্ছে!
বসুন্ধরা সিটিতে এসেছে কিছু দেশি জামাকাপড় কিনতে। জীবনে কোনো দিন সে শাড়ি পরেনি। অথচ বাঙালি মেয়েদের প্রধান পোশাক শাড়ি। শাড়ি তো এক অসাধারণ ড্রেস। দীর্ঘ দশ হাত লম্বা একটা কাপড়—যাতে কোনো সেলাই নেই, কোনো বোতাম নেই। কী অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকে শরীরে। একবার এক বাঙালি বোন কানাডায় তাকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিল। এবার কিছু শাড়ি কিনে নিয়ে যাবে। আজ আপাতত দু’একটা সুতির ফতুয়া নেবে।
বসুন্ধরা সিটির সিঁড়িতে পা দিয়েই দেখে রাস্তার ওপাশ থেকে একটা কুকুরের বাচ্চা করুণ চিত্কার দিয়ে প্রাণপণ দৌড়ে আসছে। কিন্তু কেউ বাচ্চাটিকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসছে না। বরং যার পায়ের একটু আশ্রয়-মিনতি করছে; সে-ই দূরদূর করে লাথি দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে। অসহায় ছোট বাচ্চাটি মাটিতে শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে পা তুলে যেন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে—আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও...
মনোয়ারা ছুটে গিয়ে কুকুরের বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরে, কোলে তুলে নেয়। আদর করে ডাকে—পপি। পপি মানে কুকুরছানা। আর পথের পিতামাতাহীন অবহেলিত পপিটি যেন মাদার তেরেসার আশ্রয় পেয়ে যায়। পপির গা থেকে রক্ত ঝরছে। কে যেন ইট-পাথরের ঢিল ছুঁড়েছিল। পিঠের একটা জায়গা থেঁতলে গেছে। লোমে জমাট রক্ত!
নিজের স্কার্ফ দিয়ে আলতো করে রক্ত পরিষ্কার করে। তার এই আচরণ দেখে আরিফ খুব বিরক্ত হয়। আর মনে মনে বলে, কুত্তার বাচ্চা নিয়ে এই বাড়বাড়ি একেবারেই অসহ্য!
মনোয়ারা কাপড়চোপড় কেনা বাদ দিয়ে পাশের সেবা ফার্মেসিতে ছুটে যায়। ফার্মেসিতে ডাক্তার নেই। কম্পাউন্ডার জানায়, তারা মানুষের চিকিত্সা দেয়, মানুষের জন্য ওষুধ বিক্রি করে। এখানে কুত্তার চিকিত্সা নেই, কুত্তার ওষুধ নেই। এমনভাবে ‘কুত্তা’ শব্দ উচ্চারণ করে, তাতে মনে হয় গালি দিচ্ছে।
মনোয়ারা বাংলা না বলতে পারলেও কিছুটা বুঝতে পারে। সে ইংরেজিতেই বলে, ‘এটা তো কুত্তা নয়; কুকুরের ছানা। পপি। আমার পপি।’
—হ। নায়িকা পপি। নিয়ে সিনেমা বানান। হাহাহাহা...
—হোয়াট!
মনোয়ারা এবার আর কিছুই বুঝতে পারল না। আরিফ বলল, ‘তোমার পপিকে পশু হাসপাতালে নিতে হবে। পশুর ডাক্তার দেখাতে হবে। পশু হাসপাতাল তো মনে হয় শ্যামলীতে কোথায় যেন আছে। শুনেছি। মনে করতে পারছি না।’
একজন পথচারী বলল, ‘কাঁটাবনে যান। সেখানে অনেক পশু-পাখি, কুকুর-বিড়াল, বেজি-বানরের দোকান আছে। তারা খোঁজখবর দিতে পারবে। হয়তো কিছু প্রাথমিক চিকিত্সাও থাকতে পারে।’
মনোয়ারা আরিফকে নিয়ে ছুটে যায় শাহবাগের কাঁটাবনে। পথের নামহীন গোত্রহীন পপির পিঠের রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্নের সাথে মনোয়ারা নিজের পিঠের ক্ষতের দাগ মেলাতে থাকে।
 
দুই.
পপি আর মনোয়ারা যেন অনাথ আর এতিমের প্রতীক! পৃথিবীতে এদের কেউ নেই। এরা এভাবেই বেড়ে ওঠে, এভাবেই বড় হয়। জন্মই তাদের আজন্ম পাপ। আহ, স্বাধীনতা কী সুন্দর! আর সেই সুন্দরের ভেতর একটি কালো দাগ চাঁদের কলঙ্কের মতো।
নয় মাসের এই মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লাখ শহীদের পাশাপাশি নির্যাতিত হন দুই লাখ নারীও। তাঁদের গর্ভে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশুদের প্রতিপালনের ব্যাপারে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, নরওয়ে সাড়া দিয়েছিল। আর তার আগেই কলকাতার মা মাদার তেরেসা ধাইমার ভূমিকা নিয়েছিলেন।
৪৩ বছর পর মাতৃভূমিতে মায়ের সন্ধানে এসে অনেক ইতিহাস জানছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনেক কিছু দেখেছে। দেখেছে ১৯৭১। দেখে দেখে কেঁদেছে। নির্যাতিত নারীদের মাঝে মাকে খুঁজেছে। এরাই মনোয়ারার মা। তার এক মা এখন হাজার হাজার মা হয়ে গেছে। সন্তান প্রসবিত মৃত মায়ের ঐতিহাসিক ছবিটাই কি তার মা? আজ তার মনে নানা প্রশ্ন উদয় হচ্ছে। যে সব প্রশ্নের উত্তর নেই!
—তার মায়ের কী নাম ছিল? আনোয়ারা।
—মা কি দেখতে তার মতো ছিল? যেমন জুলিয়া নিজের মতো।
—তার অবৈধ বাবা ছাড়াও কি মায়ের সুখের জীবনে তার আরেক জন মুক্তিযোদ্ধা বাবা ছিল? সেই অপরাধে রাজাকারেরা মা আনোয়ারাকে খান সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছে। সেই বাবা কি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে?
—এই দেশ কেন তাকে থাকতে দিল না, কেন এই দেশের কোথাও জায়গা হলো না মনোয়ারার? সমাজের শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বিতাড়িত করা হলো? মনোয়ারারা তো বাংলাদেশেরই সন্তান। শুধু সন্তানই নয়, এই দেশের রক্তাক্ত জন্ম প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশও তারা। কিন্তু কেন তাদের জায়গা হলো না এদেশে?
মনোয়ারা বড় সরল। সবকিছু বোঝে না সরলরেখায়। কিন্তু তার জীবনটা বাংলাদেশের ‘বা’, আর কানাডার ‘কা’ যুক্ত হয়ে বাঁকা হয়ে গেছে। আর বাঁকার মাখখানে পাকিস্তানের ‘চন্দ্রবিন্দু’ চাঁদের কলঙ্কের তিলক হয়ে আছে। মনোয়ারার জীবনে এক জটিল অংক! গল্প-উপন্যাসের চেয়েও বীরাঙ্গনা আনোয়ারা আর যুদ্ধশিশু মনোয়ারাদের জবাবহীন জীবন আরও অনেক বেশি জটিল। আনোয়ারা আজ কোথায়? মনোয়ারারা দেশ থেকে দূরে থাকলেও ইতিহাস থেকে দূরে নয়।এখন অনেক রাত। ডিসেম্বর মাস। বাইরে বেশ শীত। যদিও কানাডার মতো না। তবু মনোয়ারা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ছাদে যায়। তার আগে দেখে নেয় পপি ঘুমুচ্ছে। নির্জন ছাদে শীতের হালকা কুয়াশা আর চাঁদের আলো মিলেমিশে একাকার! আহ, গায়ে জড়ানো চাদর যেন মায়ের আদর। কুয়াশা আর জোছনার মিলমিশ যেন আনোয়ারা-মনোয়ারা মহা মিলন! ইশ, এখন যদি আকাশ থেকে পরী হয়ে চুপিচুপি আমার মা আমার কাছে চলে আসত। শুধু একটি বারের জন্য। শুধু একটি বার। পাশের বাড়ির নিমফুল নাকি শিউলি ফুলের হালকা মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে, আমার মায়ের চুলের ঘ্রাণ!
মা, আমি তো তোমার কাছে এসেছি। তুমি আমার কাছে এসো। আমাকে প্রাণ ভরে একটু আদর করো, একটু স্নেহ দাও। জননী আমার, আমাকে তোমার বুকের মাঝে জড়িয়ে নাও। মা, মা গো, ও মা; আমি চির দুঃখিনী এক মেয়ে। এই বিশাল পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। আমি বড় তৃষ্ণার্ত মা। তোমার বুকের দুধ দিয়ে আমার তৃষ্ণা মিটাও। বুক ভেঙে কান্না আসে। হু হু করে কেঁদে ওঠে মনোয়ারা।
 
তিন.
মনোয়ারার মা নেই। মাতৃভূমি বাংলাদেশই তো তার মা। জন্মভূমিই আজ জননীর মাত্রা পেয়েছে। তাই জন্মভূমিতে এসে মনোয়ারা আজ তৃপ্ত, ধন্য। সারা জীবনের বেদনা, বুকের ভার অনেকটা হালকা হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষ তাকে এত আপন করে নিয়েছে। সবাই যেন তার আপনজন, আত্মীয়! প্রত্যেকের আতিথেয়তা আর আন্তরিকতায় সে মুগ্ধ। সে সেখানে যাচ্ছে, সেখানেই মনে হচ্ছে ফুলের বাগান। আর সে যেন স্বপ্নের ফুলপরী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
কখনোই ভাবতে পারেনি, দেশের মানুষ তাকে এভাবে বরণ করে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করবে! মনে হচ্ছে, এই বিজয়ের মাসে তার আগমন যেন সবার হূদয়ে নাড়া দিয়েছে। মিডিয়া তাকে সে সন্মান দিয়েছে, তা ভাবলে চোখে জল এসে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহায়তায় অবশেষে মনোয়ারা তার জন্মসনদ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। জন্মসনদটা বুকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। বুকের প্রেশার কুকার থেকে শব্দ আর ধোঁয়ার মতো বের আসে দীর্ঘ ৪৩ বছরের কষ্টগুলো, বেদনাগুলো!
এত দুঃখ কষ্টের পরও ১২ বছর আগে ফিনল্যান্ডের এক যুবককে বিয়ে করেছিল। তাঁদের প্রতিবন্ধী সন্তান জুলিয়েটের জন্মের পরই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায় তার। এই অটিস্টিক বেবির জন্য মনোয়ারাকে অভিযুক্ত করে তার স্বামী বলেছিল, তুমিই এর জন্য দায়ী। কারণ, আমার পরিবারের পরিচয় আছে। তোমার কোনো পরিচয় নেই, মা নেই, বাবা নেই—তুমি একটা ওয়ারবেবি, আর সেকারণেই তোমার বেবিটা অটিস্টিক হয়েছে।
শুধু প্রাক্তন স্বামীই নয়; বিশ্ববাসীকে আজ তার খুব জানাতে ইচ্ছে করে, আমি আমার জন্মস্বীকৃতি পেয়েছি। আমি বাঙালি, আমি আজ স্বীকৃত বাংলাদেশি।
সেই কথা মনে করে মনোয়ারা একবার আনন্দে হাসে, আবার বেদনায় কাঁদে। হাসতে হাসতে, কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মাই হোল লাইফ ইজ ফুল নেগলিজেন্সিস, আপস অ্যান্ড ডাউন, ব্রোকেন রিলেশনশিপ, অল দিজ মেইড মি সো স্যাড। সো স্যাড। আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই বার্থ সার্টিফিকেট। আই ওয়ান্ট টু লিভ মাই লাইফ অ্যাজ বাংলাদেশি। আই অ্যাম ডটার অব  জয় বাংলা!’