রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে গঠিত তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থ এখনো জোগাড় হয়নি। যে পরিমাণ অর্থ আছে, তা দিয়ে ক্ষতিপূরণের ৭০ শতাংশ পরিশোধ করা যাবে। তবে আইএলওর (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) নেতৃত্বাধীন এই তহবিল সমন্বয়কারী কমিটি আগামী মার্চের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করতে চাচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন আরো ৬০ কোটি টাকা। সংস্থাটির নেতৃত্বাধীন রানা প্লাজা সমন্বয় কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের রানা প্লাজার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থপ্রাপ্তির জন্য এখনো চেষ্টা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা না পাওয়া গেছে রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে অর্থ দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হবে।
শ্রমিক নেতা সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহমেদ সমন্বয় কমিটির সদস্য। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আগামী এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করার লক্ষ্য রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তহবিলের লক্ষ্যমাত্রাও এক কোটি ডলার কমিয়ে ৩ কোটি ডলারের নামিয়ে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার (১৭০ কোটি টাকা) যোগাড় হয়েছে। আর ৯০ লাখ ডলার (৬০ কোটি টাকা) প্রয়োজন। ওই পরিমাণ অর্থ হলেই সব ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। মার্চের মধ্যে এ অর্থ যোগাড় করতে সর্বাত্বক চেষ্টা চলছে।
রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে আইএলও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন’ যৌথভাবে এ তহবিল গঠনে উদ্যোগ নেয়। শুরুতে এ তহবিলের লক্ষ্য ছিল ৪ কোটি ডলার বা ৩১০ কোটি টাকা। তবে সমন্বয় কমিটি সম্প্রতি হিসাব করে দেখেছে ২৩০ কোটি টাকা হলেও (৩ কোটি ডলার) ক্ষতিপূরণের পূর্ণাঙ্গ অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
এ দিকে, প্রাথমিকভাবে ক্ষতিপূরণের ৪০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের কাজটি আগামী সোমবারের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে। নিহতের পরিবারের সদস্য (যাদের সনাক্ত করা গেছে) ও আহত শ্রমিকদের মধ্য থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যকে এই অর্থ দেয়া হয়েছে। আরো প্রায় সাড়ে ৪০০ শ্রমিকের পরিবারের সদস্যকে এই অর্থ দেয়া হবে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে মারা যায় ১ হাজার ১৩৮ জন। আর গুরুতর আহত হয় আরো অন্তত ১ হাজার শ্রমিক। ওই ভবনের ৫টি কারখানায় কাজ করত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক।
সমন্বয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের জন্য গঠিত রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ড থেকে তিন কিস্তিতে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রায় আড়াই হাজার সদস্যকে তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের ৪০ শতাংশ দেয়া হয়েছে। এর বাইরে আগামী সোমবারের মধ্যে আরো সাড়ে ৪০০ সদস্যকে অর্থ দেয়া হবে। এই অর্থ দেয়া হলে ৪০ শতাংশ ক্ষতিপূরণের অর্থ (দাবিনামা অনুযায়ী যাদের শনাক্ত করা গেছে) প্রদান কাজ সম্পন্ন হবে। এর পর তাদের সবাইকে বাদবাকি অর্থ প্রদান করা হবে। এর বাইরে প্রাইমার্ক নিউ ওয়েভ বটমের ৬০০ শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।
এখনো ক্ষতিপূরণের দাবি উঠছে বিশ্বব্যাপী:
রানা প্লাজার ৫টি গার্মেন্টস থেকে পোশাক কিনত অন্তত ২৮টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এসব ব্র্যান্ডকেই লক্ষ্য করেই মূলত আইএলওর ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু দেড় বছরে ১৩টি ব্র্যান্ড অর্থ প্রদান করেছে। বাদবাকি অন্তত ১৫টি ব্র্যান্ড কোনো অর্থ দেয়নি। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক ছাড়াও বোনমার্শে, সিএন্ডএ, লোবলো, চিলড্রেন্স প্লেস, ওয়ালমার্ট, এইচএন্ডএম, ইনডিটেক্স, কেআইকে, ম্যাঙ্গো, ম্যাটালান, মাসকট ও প্রিমিয়ার ক্লদিং অর্থ দিয়েছে। রানা প্লাজার কারখানা থেকে পোশাক ক্রয় করেনি— এমন একাধিক ব্র্যান্ডও এতে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু ক্যারিফোর, জেসি পেনি ও বেনেটনসহ অনেক ব্র্যান্ডই ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সাংগঠন ক্লিন ক্লদস ক্যাম্পেইন আগামী এপ্রিলের আগেই এ সব ব্র্যান্ডকে ক্ষতিপূরণ তহবিলে অর্থ প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি তাদের ওয়েবসাইটে অর্থ প্রদানকারী ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি যারা অর্থ প্রদান করেনি তাদের তালিকাও প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, ক্ষতিপূরণের জন্য আর কত অপেক্ষা? সংগঠনটির আহ্বানে গত ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানবাধিকার কর্মীরা সমবেত হয়েছে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বেনেটনের বিভিন্ন আউটলেটের সামনেও তারা জড়ো হয়েছে।