এবারের একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রকাশ হয়েছে শিক্ষাবিদ ও কথা সাহিত্যিক প্রফেসর ড. সরকার আবদুল মান্নান-এর বই ‘শিক্ষা:আলোকিত প্রজন্ম’। বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, তার মেরুকরণ ও সার্বিক ফলাফল আমাদের মনে নানা অতৃপ্তির জন্ম দিচ্ছে। লেখক এই বইয়ের মাধ্যমে এসকল অতৃপ্তি থেকে উত্তরণের পথ অনুসন্ধান করেছেন। বই সম্পর্কে লেখক বলেন,
‘শিক্ষা:আলোকিত প্রজন্ম’ বইয়ে আমার মূল আলোচনার বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের ভালোফল করার জন্য পরিবার, স্কুল থেকে যে চাপ দেয়া হয় তাতে শৈশব জীবনের আনন্দঘন সময়টা তারা হারিয়ে ফেলছে। এটা শুধু ঢাকা নয় সারাদেশের শিক্ষার্থীদের শৈশবই হারিয়ে গেছে। ফলে তারা ভালো মানুষ হিসাবে গড়ে উঠছে না। তাদের ভালো মানুষ হিসাবে গড়ার দায়িত্বটা পরিবার,সমাজের,চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের। ‘শিক্ষা:আলোকিত প্রজন্ম’ বইয়ে আমি বলেছি শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফলের পাশপাশি ভালো মানুষ হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে ফলাফলের সাথে একটা স্বার্থপরতার বিষয় আছে। এখানে শুধু আমিত্ব কাজ করে। শিক্ষা মানেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করবে, সহযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করবে । বর্তমানে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখলো শুধু এর উপরই মেধার মূল্যায়ন করা হয় । পরীক্ষায় ভালো ফল ছাড়াও অন্যান্য মেধার ও মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের মেধা বিকাশে আমাদের সকলের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু আমরা সন্তানদের মধ্যে প্রতিযোগী মনোভাব তৈরি করি। প্রতিযোগিতা ভালো। তবে প্রতিযোগিতা নিজের সাথে নিজের। আলাদা একজন মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা হলে সেটা হবে অসম প্রতিযোগিতা। একেকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একেকটা মেধা লুকিয়ে থাকে। কেউ খেলায় ভালো, কেউ সঙ্গীতে ভালো,কেউ গণিতে ভালো, আবার কেউ ইংরেজিতে ভালো। এই ভিন্ন ভিন্ন গুণের মধ্যকার প্রতিযোগিতা কীভাবে হয়? একজনের সাথে আরেকজনের প্রতিযোগিতা কোনোভাবেই হতে পারে না। মানুষের মর্যাদাবোধ, মানুষের সৌন্দর্যবোধ, রুচিবোধ, অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ তৈরি হবে শিক্ষার মধ্য দিয়ে। ব্যক্তি মানুষ পরিবার, সমাজ, দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ না। আমাদের মনে রাখা উচিত, যে আলো বাতাসে সমাজে পরিবারে সন্তান বড় হচ্ছে সে সমাজকে কি দিচ্ছে? একজন শিক্ষিত মানুষের এই বোধ থাকতে হবে যে, রাষ্ট্রের পয়সায় আমরা পড়াশোনা করছি। রাষ্ট্রের ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সবার পয়সাই এখানে আসছে কোনো না কোনোভাবে এবং সে পয়সায় আমি পড়াশোনা করছি । রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। আমাকে সেটা পালন করতে হবে। শিক্ষার সাথে ঘুষ দুর্নীতি সাংঘর্ষিক। আগে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক ছিলো মধুর। এখন যা অনুপস্থিত। ‘শিক্ষা:আলোকিত প্রজন্ম’ বইয়ে আলোকিত মানুষ কারা তা সংজ্ঞায়িত করতে চেষ্টা করেছি। আমরা মনে করি যারা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে, খুবই পরিচিত, তারা আলোকিত। যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত যাদের দেশের মানুষ চিনে, তারা আলোকিত। কিন্তু এরা আলোকিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। অতি সাধারণ মানুষও আলোকিত হতে পারে। কারণ সে মানুষের কল্যাণ কামনা করে। সে নিজের উপর সন্তুষ্ট। সে জীবনকে ভালোবাসে সে আশাবাদি মানুষ।
শিক্ষক হচ্ছে সমাজের আদর্শ। একজন শিক্ষককে সবাই অনুসরণ অনুকরণ করবে এবং তাঁকে সবাই সম্মান করবে। শিক্ষকতা আর দশটা পেশার মতো না। প্রতিনিয়ত তাঁকে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়াতে হয়। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন একজন শিক্ষকের পোশাক পরিচ্ছেদ দেখছে, তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খেয়াল করে। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে। শিক্ষকদের এ বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। তার আদর্শই শিক্ষার্থীরা ধারণ করবে।
যখন শিক্ষার্থীরা দেখছে কিছু শিক্ষক এমন একটা জাল বিস্তার করে রাখে যাতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। না হলে তাদের নাম্বার কম দিবে, তাকে নানাভাবে হেনস্তা করবে এবং প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে এমনভাবে হেনস্থা করবে একসময় বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীকে জালের মধ্যে আসতেই হয়। এরকম পরিস্থিতিতে শিক্ষক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের কি ধারণা তৈরি হয় তা সহজেই অনুমেয়। এসব অশুভ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষ শিক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলে কিন্তু কোনো কিছু না জেনে বলে। ২০১২ সালে আমার একটা বই বেরিয়ে ছিলো যেটার নাম ছিলো ‘শিক্ষা ও স্বদেশ চিন্তা’। সে বইয়েও আমি একটা কথা বুঝাতে চেষ্টা করেছি এখন যেভাবে শিশুদেরকে শিক্ষিত করা হচ্ছে , প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এতে করে তারা ভালো ফলাফল করছে, ভালো চাকরি পাচ্ছে, হয়তো প্রতিষ্ঠাও পাচ্ছে, কিন্তু মানবিক গুণসমৃদ্ধ মানুষ কি হচ্ছে? হলেও তার সংখ্যা একবারেই নগণ্য। তাহলে ত্রুটি রয়েই গেছে। শিক্ষিত মানুষ মানেই অসাম্প্রদায়িক, মানবিক গুণসমৃদ্ধ এবং মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকবে, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করবে। না হলে পূর্ণ মানুষ কখনোই হবে না। ‘শিক্ষা:আলোকিত প্রজন্ম’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে জেনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।