তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির পর শ্যালা নদী দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় মংলা বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিঘ্ন হচ্ছে মংলা বন্দরের বাণিজ্যিক জাহাজের মালামাল পরিবহন। শ্যালা নদীর দুই প্রান্তে অপেক্ষা করছে শতশত লাইটারেজ জাহাজ। বিশেষ করে সার বোঝাই লাইটারেজ জাহাজগুলো বন্দরে আটকে পড়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় সার সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি টাইম চার্টারের জাহাজগুলো লাইটারেজের অভাবে পণ্য খালাস করতে পারছে না।
গত ৯ ডিসেম্বর ট্যাংকার দুর্ঘটনার পর থেকে সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় বন বিভাগ। এ বিষয়ে সরকারিভাবে স্থায়ী কোন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মংলা বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা বলছেন, বিকল্প নৌ-রুট সৃষ্টি না করে শ্যালা নদী বন্ধ করে দেয়ায় মংলা বন্দরের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বন্ধ রয়েছে মংলা থেকে বৃহত্তর বরিশাল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে পণ্য পরিবহন। তাদের মতে, এ সব অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে আগে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-রুট ব্যবহার করা হতো। নাব্যতা সংকটের কারণে ২০১১ সালে এ রুটটি বন্ধ হয়ে গেলে ভারী নৌযানগুলো শ্যালা নদী দিয়ে চলাচল শুরু করে। বর্তমানে এ রুটটিও বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন মংলা বন্দরভিত্তিক ব্যবসায়ীরা। সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে অন্য যে পথ খোলা রয়েছে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার মংলা বন্দরে ১১টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করেছে। এর মধ্যে ৭টিই হচ্ছে সারবাহী। এ ছাড়া ১টি করে রয়েছে কয়লা, গ্যাস, কন্টেইনার ও ক্লিংকারের কাঁচামাল বোঝাই জাহাজ। শ্যালা নদী বন্ধ থাকায় মংলা বন্দরের মালামাল বোঝাই শখানেক লাইটারেজ জাহাজ পশুর নদীতে নোঙ্গর করে রয়েছে। আর শরণখোলার বগী ও পিরোজপুরের কাউখালীতেও রয়েছে কয়েকশ পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ। এগুলো খুলনা, মংলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে বালু, পাথর, তেল, গম, সিমেন্ট ও সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে ওই সব স্থানে অবস্থান করছে।
খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব ওয়াহিদুজ্জামান খান বলেন, শ্যালা নদীর পথ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল আনা যাচ্ছে না। ফলে লবণ মিলগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট থেকে খুলনায় বালু ও পাথরও আসছে না।
বিসিআইসি মংলা ট্রানজিট গুদাম ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম বিশ্বাস জানান, বৃহত্তর বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলে ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হয় মংলা বন্দর দিয়ে। মংলা বন্দরের জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজে করে এ সার পরিবহন করা হয় নদী পথে। বরিশাল, ভোলা, টেকেরহাট, বাঘাবাড়ি, আশুগঞ্জ, কাঁচপুর, আমিন বাজার ও ঘোড়াশালসহ বিভিন্ন নৌ-ঘাটে লাইটারেজ জাহাজ থেকে সার খালাস করা হয়। আর মংলা বন্দর থেকে ওইসব অঞ্চলে পণ্য পরিহনের একমাত্র সহজ নৌ-রুট হচ্ছে শ্যালা নদী।
মংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির মহাসচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, তেলের ট্যাংকার আসতে না পারায় এরই মধ্যে খুলনায় জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মংলা বন্দরে অবস্থানরত কার্গো জাহাজের মালিকেরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মংলা বন্দর ব্যবহারকারী ও শিপিং ব্যবসায়ী শেখ বদিউজ্জামান টিটু বলেন, বিকল্প পথ সৃষ্টি না করে শ্যালা নদী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। সুন্দরবনকে নিরাপদে রাখতে গিয়ে মংলা বন্দরকে ধ্বংস করা মোটেই উচিত নয়।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেন বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে সাময়িকভাবে শ্যালা নৌ-রুট বন্ধ রাখা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত এ রুট দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল করতে দেয়া সম্ভব নয়।
এদিকে মংলা বন্দর সচল রাখার লক্ষ্যে শ্যালা নদীসহ সকল নৌ-রুট চালুর দাবিতে গতকাল সকালে শহরের শেখ আবদুল হাই সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে মংলাবাসী।