নিঃসঙ্গতার ভেতরে থাকতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন বোধ করি তার সৃজনের ভেতরে সৃজিত হয়েছিল শিল্প। শিল্পবোধ। সেই শিল্প আর শিল্পবোধকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক বছর আগে, বিশেষত তত্কালের পূর্বপাকিস্তানের শেষের দিকে জনাকয়েক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলচ্চিত্র আন্দোলনের সুষ্ঠু ধারার প্রবর্তন শুরু করেছিলেন তার প্রথম দিকেই মাহবুব জামিল, ফারুক আলমগীর, মুহম্মদ খসরুসহ আরও অনেকেই।
১৯৭৩/৭৪ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি নতুন ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং জাকির সঙ্গে আমরা অনেকেই যুক্ত হয়েছিলাম সেই নতুন ধারার চলচ্চিত্রের ছত্রচ্ছায়ায়। বিশেষত তখনকার দিনে গুলিস্তান বিল্ডিং-এর গুলিস্তান সিনেমা হল এবং নাজ নামের আরও সিনেমা হলে শুধুমাত্র ইংরেজি সিনেমা দেখানো হতো। জাকি ভাইয়ের একান্ত প্রচেষ্টায় সদ্য স্বাধীন দেশে ভারতীয় বাংলা ছায়াছবিসহ ভালো ভালো বিদেশি ছায়াছবিগুলো ঐ নাজ প্রেক্ষাগৃহেই দেখতে পেতাম।
সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ছবিগুলো দেখতে যেতেন অনেকেই। ১৯৭৩ অথবা ৭৪ সালে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল শাহবাগে বাংলাদেশ বেতারের আবুলের ক্যান্টিনে। সেখানেই জানতে পারলাম ঋত্বিক ঘটক বাংলাদেশে এসেছেন অদ্বৈত মল্ল বর্মনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে। ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুর রহমান খানসহ অন্য প্রযোজকেরা আড্ডা দিচ্ছিলেন ঋত্বিক বাবুর সঙ্গে। আর সহকারীরূপে ছিলেন শিল্পী কালো মহিউদ্দিন শিল্প নির্দেশনার জন্য এবং আরেক সহকারী ছিলেন মুহম্মদ খসরু। বেশ কয়েক মাস পরেই আমাদের অগ্রজ জিয়া হায়দার প্রতিষ্ঠিত নাগরিক সম্প্রদায়ের প্রযোজিত বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকের মহড়ার সময় আমার চেয়ে বয়সে বেশ কয়েক বছরের বড়ো এক ভদ্রলোককে দেখলাম। ‘কাঁধে রোলি ফ্ল্যাক্স’ ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেশ অনেকগুলো ছবি তুলতেন, একজন অভিনেতা জানতে চাইলেন ক্যামেরাম্যানের নিকট থেকে, তিতাস একটি নদীর নামের সিনেমাটি আমরা কবে নাগাদ দেখতে পাবো। যেহেতু খসরু ভাই, আপনি তো ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে ঐ ছবিতে কাজ করছেন। খসরু জানালেন, শ্যুটিং এখনো শেষ হয়নি।
মুহম্মদ খসরুকে প্রায়শই দেখতাম ঢাকা স্টেডিয়ামের নিচতলায় ‘প্যাপিরাস’ নামের একটি বুকস্টলে বই কিনতে। ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলায় ছিলো দুইটি বই-এর দোকান। (১) স্টান্ডার্ড পাবলিসার্স (২) প্রভিনশিয়াল বুক ডিপো। স্টান্ডার্ড পাবলিসার্স ছিলো বই-এর বিশাল ভাণ্ডার এবং সেখানেই সবচেয়ে কম মূল্যে পাওয়া যেতো সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে বাংলা অনূদিত বইগুলো।
প্রায়শই দেখতাম তাজউদ্দিন আহমদকে। তিনি অনেকগুলো বই কিনতেন তাঁর পছন্দের। জীবনে তাঁর সঙ্গে বার কয়েক কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। মাঝে-মধ্যে আরও দেখতাম মুহম্মদ খসরুকে আর কবি ফজল শাহাবউদ্দিনকে। বই কিনতেন প্যাপিরাস ও স্টান্ডার্ড পাবলিসার্স থেকে। সেই প্যাপিরাস সেই স্টান্ডার্ড পরবর্তীকালে আর চোখে না পড়লেও মুহম্মদ খসরুকে দেখেছি আজিজ মার্কেটে বই কিনতে।
খসরু ভাই কোথায় যে কী করতেন সেটি জেনেছি অনেক পরে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা—বিসিকের জনসংযোগ বিভাগের নির্বাহী হবার সুবাদে। বিসিকের নকশাকেন্দ্রের দুইজন ক্যামেরাম্যানের ভেতরে ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান এবং মুহম্মদ খসরু। আমার বিসিকে যোগ দেবার আগেই নকশাকেন্দ্রের প্রধান ছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান। পরবর্তীকালে নকশাকেন্দ্র প্রধান হয়ে এসেছিলেন এমদাদ হোসেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে নকশাকেন্দ্রের প্রধান নকশাবিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরের এমদাদ হোসেন, মুহম্মদ খসরুকে স্নেহ করতেন তাঁর শিল্পসত্তার জন্যে। উপরন্তু দুইজনই ছিলেন রোহিতপুর নিবাসী।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিসিকের চেয়ারম্যান হয়ে এসেছিলেন সিএসপি মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন। তিনিও মুহম্মদ খসরুকে স্নেহ করতেন, খসরুর চলচ্চিত্র বিষয়ক অন্যান্য কর্মকাণ্ডের জন্য। আমি প্রায় সময়ই তার ফটোগ্রাফি সেকশনে গেলে দেখতাম তিনি চলচ্চিত্র বিষয়ক ইংরেজি বই পড়ছেন। যদিও তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। তার হাতে ক্যামেরাও কম দেখেছি, যতোটা দেখেছি বাংলা ইংরেজি বই। যা ছিলো চলচ্চিত্র বিষয়ক। মাহবুব জামিল, মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত চলচ্চিত্র পত্রিকাটি ভীষণভাবে সমাদৃত হয়েছিলো শিল্প প্রেমিকদের নিকট। মুস্তাফিজুর রহমান আবার ভ্রমণসঙ্গী হয়ে থাকতেন সমগ্র বাংলাদেশে। হঠাত্ একদিন আমার অফিস কক্ষে আরজ আলি মাতুব্বর এলেন। আমার আর আরজ আলীর ছবি মুস্তাফিজ তুললেন। ওয়াশ করলেন খসরু ভাই। সাদা-কালো ছিলো সেই সময়ের ছবি।
খসরু ভাই ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে কষ্ট পেতেন যদি কোনো ভদ্রলোক অসঙ্গত আচরণ করতেন। তার আরও দুঃখ জ্বালা ছিলো প্রতিদিন তাকে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে যেতে হতো রোহিতপুর। উপরন্তু ছিলো না তার পারিবারিক জীবন। অকৃতদার মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিলো শাহবাগের আজিজ মার্কেটের একটি বই-এর দোকানে। সেদিনও অনেক স্মৃতিচারণ হলো বিসিক নিয়ে। সেদিনও দেখলাম তার হাতে ইংরেজি এবং বাংলা বই— যা ছিলো চলচ্চিত্র বিষয়ক। গত কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে জানতে পারলাম মুহম্মদ খসরু পা বাড়িয়েছেন অনন্তের দিকে, সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে।
n লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক