বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হবে

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোন জাতির জন্য একটি শক্তিশালী পেশাদার ও আধুনিক বিমানবাহিনী অপরিহার্য। এ কথা অনুধাবন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও একটি দক্ষ ও চৌকস বিমানবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গতকাল বুধবার যশোর বিমানবাহিনী একাডেমি প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত ৭০তম ফ্লাইট ক্যাডেট কোর্সের কমিশন প্রদান উপলক্ষে শীতকালীন রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ ২০১৪ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিমানবাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় উপকরণ ছাড়াই শুধু একটি এ্যালুয়েট হেলিকপ্টার, একটি ডিসি-৩ ও একটি অটার বিমান নিয়ে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনে বিমানবাহিনী ৪০টিরও বেশি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। যা ছিল আমাদের বৈমানিকদের অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাগণ সেক্টর কমান্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানবাহিনীর সদস্যদের এই দুঃসাহসিক অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। এসব কারণে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানবাহিনীর রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের নিরাপত্তা, সমুদ্রসীমা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি ও দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে জাতির পিতা চট্টগ্রামে জহুরুল হক ঘাঁটির গোড়াপত্তন করেন। গত ৮ নভেম্বর বর্তমান সরকার এই ঘাঁটিকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করে। জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে বিমানবাহিনীতে অত্যাধুনিক মিগ-২১ সুপারসনিক ফাইটার স্কোয়াড্রন, এমআই-৮ হেলিকপ্টর, এএম ২৪ পরিবহন বিমান ও এয়ার ডিফেন্স র্যাডার সংযোজন করেন। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখনই বিমানবাহিনীর উন্নয়নে অবদান রাখছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার বিমানবাহিনীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ঢেলে সাজাচ্ছে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য অত্যাধুনিক সুবিধাসহ বিমানবাহিনী একাডেমিতে ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এর আলোকে বিমানবাহিনীর একাডেমী অফিসার ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ আগামী জানুয়ারি মাস থেকে তিন বছরে উন্নীত করা হচ্ছে। অতিসম্প্রতি ঢাকা হেলিকপ্টার ওভারহাল প্লান স্থাপন করা হয়। ৫টি নতুন এমআই ১৭১ হেলিকপ্টর, ৯টি বেসিক টেইনার বিমান, তিনটি ট্রান্সপোর্ট ট্রেইনার বিমান, দুইটি মেরিটাইম সার্চ এন্ড রেসকিউ হেলিকপ্টার ও ১৬টি কমব্যাট ট্রেইনার অচিরেই বিমানবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে। চীন থেকে আনা জেট ট্রেইনার কে-৮ ডব্ল্বিউ বিমান ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার তিন বাহিনী সদস্যদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। চাকরির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী মিশনে বিমানবাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিমানবাহিনীতে নতুন নতুন ইউনিট স্থাপনের ফলে জনবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি পদোন্নতির পথও সুগম হচ্ছে। ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আওতায় নতুন নতুন বিমান ও হেলিকপ্টার যুক্ত হওয়ার ফলে বিমানবাহিনীর সামর্থ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা কার্যক্রমের অধীনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার উড্ডয়ন ঘণ্টা সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করে যাচ্ছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্তব্য, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কমিশনপ্রাপ্তদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অকৃত্রিম দেশপ্রেমের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে আপনাদেরকে মহান দায়িত্ব পালন করতে হবে। কর্মে ও চিন্তায় বাংলার আকাশ মুক্ত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি স্মরণ রাখতে হবে স্বাধীনতার জন্য লক্ষ ত্যাগ ও তিতিক্ষার ইতিহাস। আপনারা এই বিমানবাহিনীর ভবিষ্যত্ কর্ণধার। এই বাহিনীর যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। সহকর্মী ও অধীনস্থদের কল্যাণকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সহানুভূতির সাথে দেখতে হবে। 
গতকাল মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজে মহিলা ফ্লাইট ক্যাডেটদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, কমিশনপ্রাপ্তি নারী অধিকার রক্ষা ও সামাজিকভাবে নারীকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের দৃঢ় নীতিরই প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০০ সালে সশস্ত্র বাহিনীতে কমিশন অফিসার পদে নারীদের অন্তর্ভুক্তির যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তিতে বিমানবাহিনীকে আরো আধুনিক করে কৌশলগত দিক থেকে একটি সুদৃঢ় শক্তিশালী ও কার্যকর বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলবেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ এবং ফ্লাইট ক্যাডেটদের মাঝে পদক, সনদপত্র ও ফ্লাইং ব্যাজ বিতরণ করেন। এসময় বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ ২০১৪ এর ৭০তম ফ্লাইট কোর্সের ২৭ জন, ১৪তম এসএসসি ও এসপিএসএসসি কোর্সের ১৫ জনসহ মোট ৪২ জন ফ্লাইট ক্যাডেট কমিশন লাভ করেন। এরমধ্যে ৬ জন মহিলা ফ্লাইট ক্যাডেট কমিশন লাভ করেছেন। ফ্লাইট ক্যাডেট উইং আন্ডার অফিসার ধ্রুব সরকার ৭০তম ফ্লাইট ক্যাডেট কোর্সের সেরা চৌকস কৃতিত্ব এবং সেরা জেনারেল সার্ভিস প্রশিক্ষণ কৃতিত্বের জন্য যথাক্রমে ‘সোর্ড অব অনার’ এবং কমান্ড্যান্টস ট্রফি লাভ করেন। উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট মো. ইশতিয়াক নাফিজ চৌধুরী বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ট্রফি লাভ করেন। গ্রাউন্ড ব্র্যাঞ্চ এর সেরা কৃতিত্বের জন্য ফ্লাইট ক্যাডেট সার্জেন্ট সংগীত তরফদার বিমান বাহিনী প্রধান এর ট্রফি লাভ করেন। এছাড়া সার্বিকভাবে বিমানবাহিনী একাডেমীর ২ জন স্কোয়াড্রন চ্যাম্পিয়ন বিবেচিত হয়ে একাডেমী পতাকা লাভ করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, নৌবাহিনী প্রধান, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বৈদেশিক মিশনের কূটনীতিকগণ, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী প্রধানগণ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অভিভাবকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।