স্বামীর সঙ্গে আমাদেরও পুড়িয়ে মারুন

টানা অবরোধে দিনমজুর ও অসহায় মানুষের ওপর বোমা হামলা এবং যানবাহনে অগ্নি-সংযোগে দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। অবরোধের এ চরম নৃশংসতার শিকার আরেক দিনমজুর লেগুনা গাড়ি চালক মো. সেলিম (৩৫)। গত রবিবার সন্ধ্যার পর দক্ষিণ কমলাপুর বাজার রোডে লেগুনা গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে কয়েকজন পিকেটার। এসময় গাড়িচালক মো. সেলিমের শরীরে আগুন ধরে যায়। কোন রকমে গাড়ি থেকে বের হন তিনি। কিন্তু ততক্ষণে তার মুখমণ্ডল, হাত ও বুকের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়। তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তার শয্যা পাশে স্ত্রী হাসি আকতার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।

হাসি আকতার বলেন, দুই শিশু সন্তান নিয়ে আমার সংসার স্বামীর আয়ের উপর চলতো। এখন আমি কি করব? শিশু সন্তানরা কোথায় যাবে? কে আমাদের খাওয়াবে? দয়া করে যারা পেট্রোল বোমা মারেন কিংবা গাড়িতে আগুন দেন, তারা আমার দুই সন্তানকেও পুড়িয়ে মেরে ফেলুন। জীবিত থাকলে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে শিশু সন্তানদের খাওয়াতে পারবো না। স্বামীর সঙ্গে আমাদেরকে পুড়িয়ে মেরে ফেললে আমরাও বেঁচে যাই। অন্যথায় নিরীহ মানুষ ও অসহায় দিনমজুরের ওপর বোমা মারা এবং গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করুন। যারা এ ধরনের চরম নির্দয় ও নিষ্ঠুর কাজটি করেন তারা ভেবে দেখুন, যারা আগুনে পুড়ছে তারা আপনাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও সন্তানের মতো। আপনারাও এ ধরনের পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নিয়েছেন। পিতা-মাতা কিংবা ভাই-বোন ও সন্তানের ওপর বোমা হামলা অথবা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ থেকে বিরত থাকুন। স্বামীর মাথায় হাত দিয়ে হাসির এ ধরনের হূদয় ছোঁয়া বিলাপে বার্ন ইউনিটে শোকের ছায়া নেমে আসে।
হাসি রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের বলেন, আমাদের মত নিরীহ ও গরীবদের মেরে ক্ষমতায় গিয়ে কিংবা ক্ষমতায় থেকে শান্তি পাবেন না। দয়া করে এ নিষ্ঠুর কাজটি বন্ধ করুন। মতিঝিল-মুগদা রুটে লেগুনা গাড়ি চালান সেলিম। স্ত্রী হাসি ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে মুগদা মদিনাবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক কন্যা নিয়ে সুখের সংসার ছিল সেলিমের। দৈনিক যা আয় করেন তা দিয়ে সংসার মোটামুটি চলে যায়। একমাত্র উপার্জনকারী সেলিম এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তার সংসারে নেমে আসবে অভাবনীয় দুর্দশা।

বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, সেলিমের মুখমণ্ডলের চেয়ে তার শ্বাসনালী পুড়ে গেছে বেশি। এ কারণে তার বেঁচে থাকার বিষয়টি আল্লাহই জানেন। সেলিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার সুচিকিত্সার্থে যা প্রয়োজন সবই করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। সেলিমকে নিয়ে এ পর্যন্ত অবরোধের নৃশংসতায় দগ্ধ হয়ে ১০ জন বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন আছেন। তাদের কেউ যানবাহনের চালক অথবা নিরীহ যাত্রী।