বড় ধাক্কায় অর্থনীতি

গেল সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার রেশ কাটিয়ে অর্থনীতি যখন অগ্রসর হচ্ছিল, তখনি আবার বড় ধরনের ধাক্কা খেল। হরতাল আর অবরোধের মত কর্মসূচি অব্যাহত থাকায় থমকে গেছে বাণিজ্য ও শিল্প উত্পাদন প্রক্রিয়া। এমনিতেই জ্বালানি সংকটের মুখে একটু একটু করে আগের বছরের ক্ষতি কাটানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় ক্ষ্যান্ত না দিয়ে যেন আর উপায় নেই উদ্যোক্তাদের। বিপুল অংকের খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে গোটা ব্যাংকিং খাতই যখন কাতরাচ্ছে, তখন অস্থির রাজনীতি সবকিছু তছনছ করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্য পরিবহন থেকে জনপরিবহন, পর্যটন আয় থেকে রফতানি আয়-সবকিছুই আক্রান্ত হচ্ছে সহিংস রাজনীতির ছোবলে। ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রত্যাশিত জাতীয় আয়ে যেমন গতি সঞ্চার হবে না, তেমনি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নসাধও পূরণ দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। কেউ আসবে না এদেশ সফর করতে। সেটি হোক ব্যবসা সংক্রান্ত কিংবা ভ্রমণেও। ইতোমধ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের ক্রেতারাও বাতিল করেছে তাদের ঢাকা সফর। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্সও কমে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন, পর্যটন, পোশাক, পোল্ট্রি এবং বিমা খাতসহ দেশের সব শিল্প কারখানার উত্পাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প কারখানাগুলোর উত্পাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি পরিবহনের সুযোগ না থাকায় রপ্তানির অর্ডার সময়মতো পাঠাতে পারছেন না রপ্তানিকারকরা। এদিকে উত্পাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংক সুদের বোঝা কিভাবে সামলাবেন এই চিন্তায় উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছেন।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০১৩ সাল জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ধাক্কায় শিল্প কারখানাগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সামাল দিয়ে উঠার আগেই এক বছরের মাথায় ফের শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এভাবে চলতে থাকলে শিল্প কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। ব্যাংকের উচ্চ সুদ নিয়ে এমনিতেই ব্যবসা পরিচালনা করা খুব কঠিন। তার উপর কয়েকদিন পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এ অবস্থায় যে অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার দাবি জানান তারা।
এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বড় বড় শিল্প কারখানার পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সবজি উত্পাদকরা উত্পাদিত সবজি সরবরাহ করতে না পারায় এগুলো ফেলে দিতে হচ্ছে। অনেকেই ঋণ করে এসব চাষ করে এখন বিক্রি করতে না পারায় চাষিদের মাথায় হাত। চলমান পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র শিল্পের সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক বাকী খলীলী বলেন, সাধারণত ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত অঞ্চল কেন্দ্রিক হবার ফলে হরতাল বা অবরোধে খুব সমস্যায় নাও পড়তে পারেন। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে পণ্যের বাজারজাতকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল পরিবহনসহ কৃষি উত্পাদন দীর্ঘদিন বাজারজাত করতে না পারায় পণ্যমূল্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পোশাক খাত হারাচ্ছে অর্ডার
বছরের শুরু থেকেই টানা হরতাল আর অবরোধ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় রূপ নেয়ার আশঙ্কায় বিদেশি ক্রেতারা ২০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন বলে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সূত্র জানিয়েছে। তাছাড়া অনেক ক্রেতাই তাদের সফর বাতিল করছেন। এর প্রভাবে চলতি অর্থবছরের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দূরে থাক, গত বছরের সমপরিমাণ রপ্তানি হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিজিএমইএ’র হিসাবে গত ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫ হাজার ৫শ’ কোটি টাকার পণ্য বিমানে পাঠাতে হয়েছে এবং ৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য ডিসকাউন্ট দিতে হয়েছে। প্রতিদিন অবরোধের হরতাল বা অবরোধের কারণে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার উত্পাদন ব্যাহত হয়। আর চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম ১২ দিনের অবরোধে কেবল পোশাক খাতেই ক্ষতি হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। আর সম্প্র্রতি অর্থনীতি সমিতির সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধে গত বছরের রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে হরতাল ও অবরোধের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পোশাক খাতের উত্পাদন বেড়ে গেছে। যা এ খাতকে প্রভাবিত করবে।
পর্যটন আয় কমছে
সাধারণত শীত মৌসুমে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ভিড় করেন। এছাড়া এ সময়ে বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের আগমনের প্রবণতাও অন্য সময়ের তুলনায় বেশি থাকে। তাই এ সময় আবাসিক হোটেলগুলোতে থাকে প্রচণ্ড ভিড়। সিট ও রুম বুকিং পাওয়াই মুশকিল হয়ে যায়। আর এবার চলতি মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ায় হোটেলের বুকিং কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে মন্দার মুখে পড়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা। স্বাভাবিক সময়ে হোটেলগুলোতে দৈনিক ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষে অতিথি থাকলেও গত কয়েকদিনে তা নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে। অনেকেই রুমের বুকিং বাতিল করছেন। এদিকে ২০১৩ সালে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতায় তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে দেশের হোটেল ব্যবসায়ীরা। অনেকেই তখন তাদের শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। এরপর গত এক বছরে ২০১৩ সালের মন্দা কাটিয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি শীত মৌসুমে ফের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ায় তারা বেশ চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছেন।
পোল্ট্রি খাতে ডিম ও মুরগি অবিক্রিত
সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি খাত রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এক বছরের মাথায় ফের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। গত ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতায় ইতিমধ্যে এ শিল্পের ক্ষতি হয়েছে ২৫৬ কোটি টাকা। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাদের ২৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কারণ পরিবহনের অভাবে খামারে উত্পাদিত ডিম ও মুরগি যথাসময়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে খামারে উত্পাদিত প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ ডিম ও মুরগি অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে।
শেয়ারবাজারে লেনদেন খরা
প্রতি বছর সাধারণত জানুয়ারি মাস থেকে পুঁজিবাজারে ভালো লেনদেনের প্রবণতা দেখা যায়। অনেক কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হয় ডিসেম্বর মাসে। ফলে দুয়েক মাসের মধ্যেই এ কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ ঘোষণা করে। আর লভ্যাংশের হারের সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগকারীরা এ কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করতে থাকেন। তাই জানুয়ারি মাস থেকে পুঁজিবাজারে ভালো লেনদেনের প্রবণতা দেখা যায়। অথচ এ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ বছর তা হচ্ছে না। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১২ কার্যদিবসে গড় লেনদেন হয়েছে ৩১০ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতার তোপে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা সতর্কভাবে বিনিয়োগ করছেন। তাই লেনদেন তুলনামূলক কমে গেছে।
বিমা খাতে বাড়ছে দাবি
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) জানিয়েছে, হরতাল-অবরোধে বিমা কোম্পানিগুলোর দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি টাকা। আর সার্বিক অর্থনীতিতে দৈনিক এ ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা। হরতাল ও অবরোধের ফলে ক্ষতির শিকার হওয়ায় বিমা কোম্পানিগুলোর বিমা দাবি পরিশোধের হার বেড়ে গেছে। চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি মোটর গাড়ির বিমা দাবি পরিশোধ করতে হবে বিমা কোম্পানিগুলোকে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া বিমা কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। গত বছরও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিমা কোম্পানিগুলোকে প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি বিমা দাবি পরিশোধ করতে হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন খাতের ক্ষতি

পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অবরোধের কারণে সারা দেশে ২ লাখেরও বেশি বাস-ট্রাক অলস পড়ে আছে। এতে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে চলতি মাসে হরতাল ও অবরোধের প্রেক্ষিতে পরিবহন খাতে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এ কয়েকদিনে প্রায় চারশ গাড়ি ভাংচুরের শিকার হয়েছে। আর দুইশ গাড়ি অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এদিকে পরিবহন বন্ধ থাকলেও গুণতে হচ্ছে ব্যাংকের সুদ।