ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে প্রতিদিন ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া, দেশের ইমেজ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ছে। যা ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় পেশিশক্তি-ভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে হবে, যাতে রাজনীতির কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সংকট এমনভাবে সমাধান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট তৈরির আর কোনো সুযোগ না থাকে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপই একমাত্র পন্থা।’ রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সুপারিশ প্রণয়নে একটি সিটিজেন কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বৃহস্পতিবার ‘দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনৈতিক অচলাবস্থা’ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সব কথা বলেন।
ডিসিসিআই ভবনে আয়োজিত সভায় উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি হুমায়ুন রশিদ, সহসভাপতি মো. শোয়েব চৌধুরী, পরিচালক খায়ের মোহাম্মদ খান, আব্দুস সালাম, আতিক-ই-রাব্বানী, ওসমান গনি এবং এস রুমি সাইফুল্লাহসহ আরো অনেকে।
ডিসিসিআই সভাপতি হোসেন খালেদ তার বক্তব্যে বলেন, ‘১৬ দিনের অবরোধ বা হরতালের কারণে মোট ৩৬ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ২৭৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এই ১৬ দিনে হরতাল ও অবরোধের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ।’
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের অগ্রসরমাণ রপ্তানি খাত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় যে ইমেজ সংকট হচ্ছে, তা টাকার অংকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিজিএমইএর তথ্যমতে এক দিনের অবরোধ বা হরতালে ৬৯৫ কোটি টাকার পোশাক রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তৈরিপোশাক রফতানিতে দুই হাজার ৬০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।’
বিভিন্ন খাতে অবরোধের ক্ষতি বর্ণনা করে হোসেন খালেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে কৃষি খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা। কৃষিজাত পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের পোল্ট্রি শিল্পে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১৮ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। হিমায়িত খাদ্য খাতে প্রতিদিনের ক্ষতি প্রায় ৮ কোটি টাকা। অবরোধ ও হরতালের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ২৬ হাজার কন্টেইনার আটকা পড়ে আছে। শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রাক্কলিত জিডিপিতে এক দিনে শিল্প খাতের অবদান ৮৭৫ কোটি টাকা। বর্তমান অচলাবস্থায় শিল্পখাতে উত্পাদন সক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে প্রায় ২৫ শতাংশ। সে হিসাবে শিল্পখাতে এক দিনে (বছরে ৩০০ দিন শিল্পকারখানা উত্পাদনে সক্ষম ধরে) ২১৮ দশমিক ৯৬ কোটি টাকার উত্পাদন সক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকারও অধিক। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবরোধের কারণে পর্যটন শিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে।’
হোসেন খালেদ বলেন—টানা অবরোধের কারণে বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। দেশীয় পর্যটকরাও ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করছেন। হোটেল বুকিং বাতিল করছেন অনেকেই। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) তথ্যমতে—বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, টানা অবরোধ ও হরতাল চলতে থাকলে পর্যটন খাতে এ মৌসুমে শত কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ-এর মতে—এ খাতে প্রতিদিন ক্ষতি প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘চলমান অস্থিরতায় আবাসন খাতে প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থা সচল না থাকায় নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া, হরতাল-অবরোধের কারণে দেশের চারটি স্থলবন্দর ও বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় থেকে প্রতিদিন গড়ে সরকারের প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। বেনাপোল স্থলবন্দরে এক দিনের রাজস্ব আদায়ের ক্ষতি ৫.৩৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে ব্যবসায়ীরা আমদানিপণ্য খালাস নিতে না পারায় তারা প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।’
হরতাল অবরোধের কারণে ছোট ছোট খাতের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে ডিসিসিআই সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, ‘পাইকারি বাজার, শপিং মল, শো-রুম, ক্ষুদ্র ও ছোট দোকান খাতে প্রতিদিন ক্ষতি ১৫০ কোটি টাকা। ভ্রাম্যমাণ হকার ও অস্থায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। প্লাস্টিকদ্রব্য প্রস্তুত ও রপ্তানি খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৭.৮৫ কোটি টাকা। বিমা কোম্পানির বিনিয়োগ, আমদানি, রপ্তানি, প্রিমিয়াম আয়, বিমা দাবি পরিশোধ মিলিয়ে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।’
রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কিছু সুপারিশ তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে হবে, যাতে রাজনীতির কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সংকট এমনভাবে সমাধান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট তৈরির আর কোনো সুযোগ না থাকে। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপই একমাত্র পন্থা। পৃথিবীর কোনো দেশেই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সমাধান অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তাই সংকট উত্তরণে সংলাপ আয়োজনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। বর্তমান যুগে পেশি শক্তির স্থলে মেধা ও বুত্পত্তির সমন্বয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সব সমস্যার সমাধানে পৌঁছাতে হবে। আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আওতায় সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নির্দিষ্ট স্থানে সভা, সমাবেশ করার অধিকার থাকায় বিশ্বাসী। অন্য দিকে, রাজনৈতিক আন্দোলন কোনো অবস্থাতেই সহিংস হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রত্যাশা করি।’
সিটিজেন কাউন্সিল গঠনের তাগিদ দিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘দেশের সিনিয়র নাগরিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সিটিজেন কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে, যারা কোনোভাবেই রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হবেন না। প্রস্তাবিত এ কাউন্সিল সকল রাজনৈতিক দলকে সমানভাবে মূল্যায়ন করে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ প্রণয়ন করবে, যা প্রয়োজনে ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদেও উপস্থাপন করা যেতে পারে।’
হোসেন খালেদ বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যেহেতু বর্তমান অবস্থায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাই এ অবস্থা চলাকালে ব্যাংকঋণের সুদ মওকুফের দাবি জানাচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই ব্যাংকে কুঋণ বাড়ছে। এ পরিস্থতিতে ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ প্রদান করা প্রয়োজন। চলমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়, তার ওপর সরকার পিডিবির পক্ষ থেকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। যেখানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে, সেখানে বাংলাদেশে এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম পুনরায় বৃদ্ধি করা হলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘আগেও দুই দলকে সংলাপে আনার জন্য ব্যবসায়ী সমাজ চেষ্টা করেছে এবারও প্রয়োজন হলে সে রকম চেষ্টা করা হবে।’
হরতাল বন্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার নেয়ার ক্ষেত্রে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে ডিসিসিআই থাকবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এফবিসিসিআই সব ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ সংস্থা। সুতরাং আমরা এর বাইরে নই। তাদের সঙ্গে দ্বিমত করারও সুযোগ নেই।’