চলমান অবরোধে ব্যবসা-বাণিজ্য গতি হারাচ্ছে। ভাটা পড়েছে আমদানি-রপ্তানিতেও। ফলে স্বভাবতই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আয়ে। এই অবরোধ আরো প্রলম্বিত হলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় কমেছে। বেনাপোল, হিলি, সোনা মসজিদ স্থলবন্দরসহ বড় সব বন্দর থেকেও পণ্য খালাস কমেছে। স্বভাবতই কমে গেছে রাজস্ব আদায়। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্ সব ধরনের ব্যবসায়েই অবরোধের আঁচ লেগেছে। ফলে কমে যাবে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়। এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় বড় ঘাটতির আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আমদানি-রপ্তানি, উত্পাদন বা বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে ব্যাংক, বীমাসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়। টানা অবরোধে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবহন খাত। তাদের জন্য ঋণ পরিশোধ কঠিন হবে। ফলে ধাক্কা খাবে ব্যাংকের মুনাফাও। এটিও রাজস্বে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।
চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) আদায় হয়েছে ৫৮ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। আর বাকি অর্ধেকে আদায় করতে হবে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাকি ছয় মাসে এ বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। ফলে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। নয়তো ব্যাংক ঋণ বাড়াতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনের কোন সম্ভাবনা দেখছি না। সেক্ষেত্রে মধ্যমেয়াদে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার আকার কমিয়ে আনার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, আমদানি কমছে। ফলে শুল্কসহ অন্যান্য কর কমছে। ব্যবসা খারাপ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দিতে চাইবেন না। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে অপরিশোধিত ঋণ বাড়তে থাকায় কর্পোরেট ট্যাক্স আদায়ও কমবে। ফলে স্বভাবতই রাজস্ব আদায় বড় ধাক্কা খাবে। তিনি বলেন, চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। স্বাধীনতার পর কখনোই এ হারে প্রবৃদ্ধি হয় নি। গত অর্থবছর আদায় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, তা থেকে এক লাফে ৩০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলো।
অবরোধে আমদানি-রপ্তানি খাতের বাইরে ক্ষতির শিকার হচ্ছে এমন তালিকা বেশ দীর্ঘ। পরিবহন ও যোগাযোগ খাত, কৃষি, পর্যটন খাত এ ক্ষতির তালিকায় রয়েছে। এ তালিকায় আরো আছে উত্পাদন ও আর্থিক খাত, সিরামিক, পোল্ট্রি, প্লাস্টিক শিল্প, বীমা, হিমায়িত খাদ্য, হকার্সসহ আরো বেশকিছু খাত। এসব খাত-উপখাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা চেম্বার এক হিসাবে বলেছে, দেশের চারটি প্রধান স্থলবন্দর ও বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৪ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। চলতি জানুয়ারির শুরু থেকেই কোন না কোন কারণে হরতাল অবরোধ ছিল। সেই হিসেবে গত ২২ দিনে কেবল এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমেছে ৭৪৮ কোটি টাকা।
সারাদেশে ২০টি স্থলবন্দর থাকলেও নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি হয় যশোরের বেনাপোল, সাতক্ষীরার ভোমরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ, দিনাজপুরের হিলি, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, সিলেটের তামাবিল, কক্সবাজারের টেকনাফ ও পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে। এসব বন্দরে আমদানিকৃত পণ্যের জট লেগে গেলেও খালাস হচ্ছে কম। ফলে রাজস্ব আদায়ও কমছে।
আমাদের বেনাপোল সংবাদদাতা জানিয়েছেন, টানা অবরোধে বেনাপোল বন্দরে ১৩ দিনে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। প্রতিদিন যেখানে সাড়ে ৫শ’ পণ্য বোঝাই ট্রাক খালাস হয়ে থাকে সেখানে খালাস হচ্ছে ৩শ’ ট্রাক। ফলে বন্দরে সৃষ্টি হচ্ছে পণ্যজট।
বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি চালু থাকলেও পরিবহন সংকটে বন্দরে প্রতিদিন আমদানিকৃত পণ্যের জট বাড়ছে। নাশকতা আর আশংকার কারণে বন্দরে প্রবেশ করছে না খালি ট্রাক। ভারত থেকে গত ১৩ দিনে ৩ হাজার ৮৭৯টি পণ্যবাহী ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করলেও বন্দর থেকে খালাস হয়েছে ২ হাজার ৮শ’টি। একই সময়ে ভারতে ১৪শ’ পণ্যবাহী ট্রাক পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে ৯১৬টি পণ্যবাহী ট্রাক ।
১৩ দিনে বেনাপোল কাস্টমস্ হাউসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৯৮ কোটি টাকা। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ৬ জানুয়ারির পর দুই সপ্তাহে ৪০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় অংশেই শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে থাকে।