বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে পরিচিত এক নাম; দেশের মাটিতে শক্তিধর এক দল। কিন্তু চিরটাকাল এমন ছিল না।
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তিল তিল করে গঠন করে খেলোয়াড় হিসেবে, কোচ হিসেবে এখানে নিয়ে এসেছেন কিছু কালপুরুষ। আর তাদেরই অন্যতম ছিলেন সৈয়দ আলতাফ হোসেন। পাকিস্তান দলে ডাক পাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের এক অনন্য পেস বোলার, দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও গুরুত্বপূর্ণ কোচ এবং জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আলতাফ হোসেন আর নেই। মঙ্গলবার রাতে মারা গেছেন আলতাফ হোসেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
নিজের বাসায় অসুস্থ বোধ করলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আলতাফ হোসেনকে। সেখানে চিকিত্সকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। সৈয়দ আলতাফ হোসেনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। গতকাল নাজিমউদ্দিন রোডের হোসনি দালান মসজিদে ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তার দুটি নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৩৮ সালে বর্তমান ভারতের পশ্চিম বাংলার হুগলিতে জন্ম আলতাফ হোসেনের। দেশভাগের পর সপরিবারে চলে আসেন বাংলাদেশে। মূলত ফাস্ট বোলার ছিলেন; তবে ব্যাটিংও করতেন বেশ। ১৯৫৪ সালে কায়েদে আজম ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু। এরপর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স, পিডব্লিউডি, ইস্ট পাকিস্তান জিমখানা ও শান্তিনগর ক্লাবে খেলেছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের সেরা ক্রিকেটার ছিলেন সেই সময়ে। কোনোরকম বৈষম্য না থাকলে টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে অবশ্যই পরিচিত হতে পারতেন। টেস্ট মাঠে নামা হয়নি। তবে ১৯৬৫ সালে টেস্ট দলে ডাক পেয়েছিলেন। মার্চ মাসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে পাকিস্তান টেস্ট দলে ডাকা হয় তাকে। কিন্তু ম্যাচ খেলানো হয়নি।
ক্রিকেট খেলেছেন; পাশাপাশি তৃতীয় বিভাগ ফুটবল খেলেছেন সৈয়দ আলতাফ হোসেন। খেলেছেন বাস্কেটবলও। তবে ক্রিকেটেই নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন।
১৯৮২ সাল পর্যন্ত অল্প বিস্তর ক্রিকেট খেলেছেন। খেলোয়াড় থাকতেই, ১৯৭০ সাল থেকে কোচিংয়ে জড়িয়ে গেছেন। পাশাপাশি আম্পায়ারিংও করেছেন এক সময়। তবে কোচ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার ভূমিকা এতোটাই বড় যে, বাকি সব পরিচয় এখানে এসে হারিয়ে গেছে। কোচ হিসেবে গড়ে তুলেছেন সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভিত্তি।
ভারতের পাতিয়ালায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টস থেকে কোচিং কোর্স করে আসা বাংলাদেশের প্রথম কোচ তিনি। পরে কোচিং কোর্স করে এসেছেন ইংল্যান্ড থেকেও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আশির দশকে একাধিকবার বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। ‘এ’ দল ও বয়সভিত্তিক দলের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশে মহিলা ক্রিকেটের যাত্রা শুরুটাও হয়েছিল আলতাফ হোসেনের হাত ধরে। ১৯৮৩ সালে আবাহনীর নারী দল নিয়ে কলকাতা সফরে গিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে তাকেই বাংলাদেশ নারী দল গড়ে তোলার ভার দেয় বিসিবি। ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই কাজ করেছেন।
কার্যত এরপর থেকেই আস্তে আস্তে শারীরিক অসুস্থতা তাকে মাঠ থেকে দূরে নিয়ে যায়। ২০০৯ সালে তিনি মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হন। সে দফা ফিরে এসেছিলেন আবার। কিন্তু এবার শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন ক্রিকেট এবং এই দুনিয়া থেকে।