পতাকা হাতে রাস্তায় ব্যবসায়ীরা

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনতিবিলম্বে উদ্যোগ গ্রহণ করুন। এ অবস্থা চলতে থাকলে আইন করে হরতাল ও অবরোধ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে।

সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে সারাদেশে জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনের সামনে এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআইসহ বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবসায়ী সংগঠন অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ সময় এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান, ইউসুফ আব্দুল­াহ হারুন, মীর নাসির হোসেন, আনিসুল হক, এ কে আজাদ, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি রোকেয়া আফজাল, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি হোসেন খালেদসহ দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমাদের সম্ভাবনাময় অর্থনীতি আজ সংকটাপন্ন। বিরাজমান হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম নিরসনের জন্য সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। এজন্য দেশব্যাপী সহিংসতা ও জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। চলমান হরতাল-অবরোধে বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে এ পর্যন্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, পোশাক খাতে ক্ষতি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়িক খাতে ১৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও পোলট্রি শিল্পে ৯ হাজার ৫১৮ কোটি, পরিবহন খাতে ৯ হাজার ৫০০ কোটি, আবাসন খাতে ৭ হাজার ৭৫০ কোটি,          পর্যটনে ৬ হাজার ৫০০ কোটি, উত্পাদন খাতে ৪ হাজার কোটি এবং হিমায়িত পণ্য খাতে ২৫০ কোটি টাকা। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। চলমান সহিংসতামূলক কর্মসূচিতে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৩৩ দিনের হরতাল-অবরোধের কারণে ৮৭ জন নিরীহ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ২০০ জন বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এক হাজার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ৪ হাজার গাড়ি ভাংচুর হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বছরের শুরু থেকেই বিরামহীন অবরোধ ও হরতালে দেশের কৃষক, উত্পাদক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরাই বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। পরিবহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শুধু যাত্রীদেরই ভোগান্তি হচ্ছে না, এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে উত্পাদন এবং পণ্য পরিবহন (সাপ্লাই চেইন) ব্যবস্থায়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব পণ্যমূল্যের উপর পড়ছে। এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অস্থিতিশীলতার কারণে যদি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিরাজমান ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের চরমভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দিয়েছে। শিক্ষা জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া কোনভাবেই কাম্য নয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে বিজিএমইএ সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ক্রেতারা আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। অনেকেই এখান থেকে ফিরে যাচ্ছেন। এখানে অর্ডার না দিয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। অনেক কারখানায় কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিজিএমএইএ সভাপতি বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর একটি বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে আমাদের পক্ষ থেকে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচির আওতায় বিজিএমইএ ভবনের সামনেও গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা পতাকা হাতে অবস্থান নেন। এ সময় তারা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বন্ধে উভয় দলকে সমঝোতামূলক রাজনীতি করার আহ্বান জানান।
বিজিএমইএর কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে নাশকতার প্রতিবাদে ও গার্মেন্টস শিল্প রক্ষায় সাভারের আশুলিয়ায় সাদা পতাকা হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেছে কয়েক হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক। গতকাল রবিবার দুপুরে কলমা-আশুলিয়া সড়কের খেজুরবাগান এলাকায় রেডিয়্যান্স গার্মেন্টসের সামনে কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, হরতাল অবরোধের নামে নাশকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে নগরীতে জাতীয় পতাকা হাতে মানববন্ধন করেছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল দুপুরে এফবিসিসিআইয়ের আহ্বানে নগরীর কয়েকটি স্থানে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।  দুপুর  ১২টায় নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় চেম্বার ভবনের সামনে ১৫ মিনিটের মানববন্ধনের আয়োজন করে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। ‘সবার ওপরে দেশ, দেশ বাঁচাও, অর্থনীতি বাঁচাও’ শীর্ষক অবস্থান কর্মসূচিতে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বার, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন অংশ নেয়। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন,  দেশ ও দেশের অর্থনীতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ মেনে নেবে না। দেশ ও মানুষকে ধ্বংস করার কর্মসূচি সুস্থ রাজনীতি হতে পারে না। পুড়িয়ে মানুষ হত্যা আর পণ্যবাহী গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার রাজনীতিকে আমরা সমর্থন দিতে পারি না।
এফবিসিসিআই পরিচালক এমএ সালাম ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করেন এমন মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, ব্যবসায়ীরা না বাঁচলে দেশের অর্থনীতিও ধ্বংস হয়ে যাবে।
কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিজিএমইএ পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ, বারভিডার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক, চট্টগ্রাম চেম্বার সহ-সভাপতি সৈয়দ জামাল, উইম্যান চেম্বার সহ-সভাপতি আইভি হাসান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আকতার হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অবরোধের নামে নাশকতার প্রতিবাদে নগরীর বিভিন্ন মার্কেটের সামনেও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে শেখ মুজিব রোডে বারভিডার উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
রাজশাহী অফিস জানায়, ‘সবার ওপরে দেশ, দেশ বাঁচাও, অর্থনীতি বাঁচাও’ স্লোগানে বিরাজমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে দেশকে উত্তরণের দাবিতে এফবিসিসিআইয়ের আহ্বানে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে নগরীতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নেতৃবৃন্দ। রবিবার দুপুর ১২টায় চেম্বার ভবনের সামনের সড়কে জাতীয় পতাকা হাতে চেম্বার সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির নেতৃত্বে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এছাড়া নগরীর বিসিক শিল্প এলাকা, সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর ও তালাইমারি, নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জাতীয় পতাকা হাতে ব্যবসায়ীরা দুপুর ১২টা থেকে ১৫ মিনিট এ কর্মসূচি পালন করেন।

সিলেট অফিস জানায়: পতাকা হাতে সিলেটে এবার মাঠে নামলেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে ‘সবার উপরে দেশ, দেশ বাঁচাও-অর্থনীতি বাঁচাও” এ শ্লোগান নিয়ে ও জাতীয় পতাকা হাতে সিলেটে এবার মাঠে নামলেন ব্যবসায়ীরা। দেশের চলমান অস্থিতিশীলতা নিরসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়। রবিবার বেলা ১২টার দিকে নগরীর জেল রোডে চেম্বার ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সিলেটের সকল মার্কেট ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।