মানব পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ট্রাইব্যুনাল জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়া বাংলাদেশিরা নির্যাতন নিপীড়নের যে ভয়াবহ বর্ণনা দেন সেগুলো মেনে নেওয়া কঠিন। শুধু চুনোপুঁটিদের ধরে মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়, ধরতে হবে রাঘব বোয়ালদের; যারা দেশে বিদেশে বসে আছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত মানব পাচার বিষয়ক এক পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিয়াজুল হক এ সব কথা বলেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক সময় তথ্য না জানার কারণে মানুষ পাচারের শিকার হয়। অনেকে ভাষা জানে না। যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের যাওয়ার আগেই যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। বিমান বন্দরে দায়িত্বরত পুলিশকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি পাচারের শিকার কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়ার কাজটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রয়োজনে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য মোঃ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল গঠন এখন শুধু দাবির পর্যায়ে নেই; অনেকটা বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে চলে গেছে। পাচারের মতো অপরাধ দমনে সরকারি বেসরকারি সংস্থা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, যে কোনো উপায়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিপদে না পড়লে অনেক সময় মানুষ তথ্য জানায় না। তবে রোহিঙ্গাদের পাচার বন্ধসহ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে সরকার নজর দিচ্ছে। মানব পাচারের মামলাগুলো দেখার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে এবং জেলায় জেলায় সমন্বয় কমিটি করার কথা ভাবা হচ্ছে। তবে সব সমস্যার মূলে হচ্ছে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ঠিক না হওয়া। পৃথিবীর যেসব দেশ থেকে লোকে বিদেশে কাজ করতে যায় বাংলাদেশ সেই শীর্ষ দেশগুলোর একটি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট দুর্বলতা আছে।
অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি ব্র্যাকের জ্যেষ্ঠ পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, মানব পাচার শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের জন্যই সমস্যা। সবাই মিলে কাজ করলে রাতারাতি না হলেও যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। অভিবাসন সমস্যাসহ সামাজিক যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে ব্র্যাক বদ্ধপরিকর এবং সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে ব্র্যাক।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচক মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, সবাইকে সচেতন করার বিষয়ে আরও জোর দিতে হবে। উইনরক ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি লিসবেথ জনিভেল্ড বলেন, মানব পাচার সারা বিশ্বেও একটা সমস্যা। একসঙ্গে মিলেই সমাধান করতে হবে।
অনুষ্ঠানের মানব পাচার বিষয়ক মূল প্রবন্ধে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৫ হাজার ৭১৬টি মামলা হলেও নিষ্পত্তির ঘটনা খুবই নগণ্য। পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রম অভিবাসনের নামেও পাচার বাড়ছে।