স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর নতুন সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মোট ৮ দফা প্রশ্নের সঠিক জবাব মিললে মুক্তিযোদ্ধার সনদ মিলবে। মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় মিলবে বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা খেলোয়াড়, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংবাদিকসহ রাজনীতিকদের। তবে নতুন এই সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় ১৯৭২, ১৯৭৯, ২০১০ সালের এ সংক্রান্ত আইন-কানুন, বিধি-বিধান অনেকটাই উপেক্ষিত হবে—এমন আশংকা বিশেষজ্ঞদের।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এ প্রসঙ্গে গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, আগামী ২৮ মার্চ থেকে উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে। নির্ধারিত প্রশ্নে যারা সঠিক জবাব ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন তারা শেষবারের মতো এ সুযোগ পেতে পারেন। তিনি বলেন, ‘সকল আইন, বিধিবিধানের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই নতুন সংজ্ঞা (ক্রাইটেরিয়া) নির্ধারণ করা হয়েছে।’
নির্যাতিত হওয়ার কারণে বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলে, যারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা গণশহীদ। আগে তাদের তালিকা করতে হবে। স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু এ রকম কিছু ব্যক্তির জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছিলেন।’ মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সম্মুখ সমরে প্রাণ হারানো মুক্তিযোদ্ধা, ভারতে প্রশিক্ষণগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানকারী সহমুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা—এদের তালিকা সুষ্ঠুভাবে প্রণয়ন করাই এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব শ্যামাপদ দে ইত্তেফাককে বলেন, গণশহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আপাতত এক লাখ ৩০ হাজার আবেদনকারী এবং যাদের সনদ স্থগিত করা হয়েছে তাদের যাচাই-বাছাই শেষ হলে বাকি কাজে হাত দেয়া হবে।
সূত্র মতে, ২৮ মার্চ, ৪ ও ১১ এপ্রিল মোট তিন দিন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ হবে।
মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা
নতুন সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে সকল ব্যক্তি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গণ্য হবেন।’
এই সংজ্ঞার ব্যাখ্যা বা যেসব বিষয় বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা হবে সেগুলো হচ্ছে:যারা ভারতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাদের নাম ভারতীয় তালিকায় আছে, লালমুক্তিবার্তায় যাদের নাম আছে, যাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ আছে, যে সব পেশাজীবী বিদেশে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবদান রেখেছেন, মুজিবনগর সরকারে যারা কাজ করেছেন, সশস্ত্রবাহিনী, আনসার, পুলিশ, ইপিআর (বিজিবি) সদস্য যারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমএনএ, এমপিএগণ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত নারীগণ (বীরাঙ্গনা), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলাকুশলীবৃন্দ, দেশের বাইরে দায়িত্বপালনকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা সেবাপ্রদানকারী সেবাকর্মী।
সরকারি চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শর্ত
সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদানের সময় যাদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ ছিল না বা যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি কিন্তু ইতিমধ্যে সনদ নিয়েছেন, তারা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বিবেচিত হলে চাকরি সংক্রান্ত সকল সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন।
উল্লেখ্য, শুধু চাকরিতে প্রবেশকালে ঘোষণা না দেয়ায় ইতিমধ্যে পাঁচজন সচিবসহ ১৮৯ জন সরকারি চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধার (সনদধারী) চাকরি গেছে অথবা তাদের সুযোগ সুবিধা বাতিল করা হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংজ্ঞা ও পরবর্তী পরিবর্তনসমূহ
জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম ইত্তেফাককে বলেন, কারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হবেন সেটি ১৯৭২ সালের অর্ডারে স্পষ্ট রয়েছে। এটি নিয়ে বারবার বিতর্ক করার কিছু নেই। তার মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা ১৯৭২ সালের অর্ডারে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোনো সংগঠিত দল (ফোর্স)-এর সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন (ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) মিনস অ্যানি পারসন হু হ্যাড সারভড অ্যাজ মেম্বার অব অ্যানি ফোর্স অ্যানগেজড ইন দি ওয়্যার অব লিবারেশন)।
এ ছাড়া ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে একটি যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে নতুন সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা হয়। এরশাদ আমলেও কিছু ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা হয়।
সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীর অবসরের বয়স বাড়ানোর পর ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্কালীন সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান একটি পরিপত্র জারি করেন। এতে কারা মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী হবেন তার সংজ্ঞা বা চারটি শর্ত দেয়া হয়। এসব শর্ত হচ্ছে:যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন অথবা যাদের নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশ হয়েছিল অথবা যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সই করা সনদ রয়েছে। এ চারটির যে কোনো একটি শর্তে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ পান মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীরা। যদিও এখন বলা হচ্ছে, চাকরিতে প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধার কোটা সুবিধা না নিলে এখন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সুবিধা পাবেন না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুনর্গঠিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্য উপকমিটি একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। এ কমিটির প্রধান ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহের হোসেন। প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের প্রধান উপদেষ্টা শেখ হাসিনা ওই সংজ্ঞার অনুমোদন নাকচ করার পর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আবার আরেকটি সংজ্ঞা করে তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু করতে যাচ্ছে।