বিভীষিকায় বেঁচেছিলাম

যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইয়েমেনে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের মধ্যে আরো ৩৩৭ জন গতকাল রবিবার ভোরে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। ভারত সরকারের সহযোগিতায় ইয়েমেন থেকে জিবুতি, এরপর ভারত হয়ে বাংলাদেশ বিমানের দুটো বিশেষ ফ্লাইটে করে তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ভোরে ঢাকায় বিমানবন্দরে নামার পর মো. সালামুদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রায় ১০ দিনের মতো যোগাযোগ-বিহীন অবস্থায় ভয়াবহ এক বিভীষিকার মধ্যে বেঁচে ছিলাম। সারাক্ষণ বোমাবর্ষণের মধ্যে দিন কেটেছে আমাদের।’ 

 
সালামুদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস নেই, পানি নেই এবং পকেটে টাকাও নেই। কারণ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিক কয়েক মাস ধরে বেতন দিতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতেই কোন রকমে যখন খুব কষ্টে টিকে ছিলাম তখন আমাদের ভাগ্য খুলে গেল। উদ্ধারের খবর এলো।’ তিনি বলেন, ‘ইয়েমেন থেকে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজে করে প্রথম এলাম পাশের দেশ জিবুতিতে। তারপর সেখান থেকে ভারত হয়ে শেষমেশ বাংলাদেশে পৌঁছালাম।’
 
গতকাল ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই দলটিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অভ্যর্থনা জানান। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘রবিবার ভোরে ৩৩৭ জন বাংলাদেশি ইয়েমেন থেকে ভারত হয়ে দেশে ফিরেছে। বহুমুখী চেষ্টায় আমরা তাদের দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি।’ তিনি বলেন, ইয়েমেনে আটকে পড়া অন্য বাংলাদেশিকেও শিঘ্রই দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
 
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারত সরকারের সহায়তায় তাদের নৌবাহিনীর জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের ইয়েমেন থেকে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। জিবুতি থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজে দলটিকে কোচি বন্দরে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশ বিমানের দুইটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় আনা হয়।
 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশিদের ইয়েমেনের বিভিন্ন শহর থেকে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে নিয়ে আসা এবং জিবুতি থেকে বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত সব খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করছে। এমনকি তাদের খাওয়া খরচ এবং বিভিন্ন স্থানে রাতযাপনের খরচও বাংলাদেশ সরকার বহন করছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দফায় ৪৯৬ বাংলাদেশিকে জিবুতিতে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭৬ জন ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ এবং ২০ জন এয়ার ইন্ডিয়ার মাধ্যমে জিবুতি পৌঁছান।
 
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে ৫০০ জনের কিছু বেশি বাংলাদেশি রয়েছেন। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেনে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত। এরা সবাই তেলক্ষেত্র, মাছ ধরার জাল তৈরির কারখানা, হাসপাতাল পরিষ্কারক, সমুদ্রে মাছ ধরাসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত। সবার হিসেব সরকারের কাছে নেই।
 

জানা গেছে, এর আগে ইয়েমেন থেকে বেশ কিছু বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। ১১ এপ্রিল ইয়েমেন থেকে জিবুতি হয়ে প্রথম দফায় ১১ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এ পর্যন্ত ৩৬৩ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আর দেশে ফেরার জন্য এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি নিজের নাম নিবন্ধন করেছেন। কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস ও তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা জিবুতিতে বাংলাদেশের লোকজনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সমন্বয় করছেন। ইয়েমেনের সানা, এডেন হুদায়দাসহ বিভিন্ন শহর থেকে বাংলাদেশের লোকজনকে ভারতের বিমানে ও নৌবাহিনীর জাহাজে করে জিবুতিতে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।