আমেরিকানদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধরনের একটি ঘটনা অপেক্ষা করছে। তা হলো- ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। একদিকে টানা দুই মেয়াদ পর হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকানদের প্রবেশের চেষ্টা, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় ট্রামকার্ড এ যাবত্কালের ‘মোস্ট গ্লামারাস’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাজনীতিক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা এই নির্বাচনকে আরো আলোচনায় এনেছে। নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন সম্ভাব্য অনেক প্রার্থী। ভেতরে ভেতরে প্রচারণা শুরু করেছেন ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দুই দল থেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে ইচ্ছুক অনেকে। মূল লড়াইয়ে কার সাথে কার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে, তা নিয়েই এখন আলোচনা বিশ্লেষণ চলছে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে।
গত সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। এর আগে ২০০৮ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে প্রার্থিতা পাওয়ার লড়াইয়ে বারাক ওবামার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। হিলারি মার্কিন রাজনীতি ও প্রশাসনের শীর্ষ পদে নানামুখী দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ফার্স্ট লেডির দায়িত্ব করেছেন। এরপর ২০০০ ও ২০০৬ সালে নিউইয়র্ক থেকে সিনেটর নির্বাচিত হন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও তার সফলতা অনন্য। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাট থেকে ওবামার উত্তরসূরী অর্থাত্ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার সম্ভাবনা হিলারি ক্লিনটনের। ফলে নির্বাচনে দলটি বিজয়ী হলে ৬৭ বছর বয়সী এই নেত্রী হবেন আমেরিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। হিলারি তাই মার্কিন রাজনীতিতে বর্তমানে হয়ে উঠেছেন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাটিক দল থেকে মনোনয়ন পাওয়া হিলারির জন্য কোন ব্যাপারই না। বরং তা অনেক সহজই হবে। কারণ তার পেছনে থাকবে স্বামী বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামাসহ প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতাদের সমর্থন। তবে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থীর জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেট দুই কক্ষ আগে থেকেই দখলে রেখেছে রিপাবলিকান দল। জনগণের একান্ত মনোযোগ ও অনুগ্রহ ছাড়া নির্বাচনে জয়লাভ করা হিলারির জন্য অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে। অনেকে আবার বলছেন, আমেরিকার মানুষ নতুন কিছু বা ভিন্ন কিছু পছন্দ করে। ভোটে জনগণের সেই পছন্দের প্রভাব পড়লে তা হবে আমেরিকার ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়া ছাড়াও হিলারির মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পাবে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতার স্বাদ।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনেকেই মাঠে নামতে পারেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এর মধ্যে কেবলমাত্র রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য দুই প্রার্থী টেড ক্রুজ এবং র্যান্ড পল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতার লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। কানাডায় জন্মলাভকারী টেড ক্রুজ টেক্সাসের সিনেটর। ওবামার স্বাস্থ্য সেবা বিলের বিরুদ্ধে সিনেটে ২১ ঘন্টা বিতর্ক করার রেকর্ড রয়েছে তার। রিপাবলিকান দলের আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী র্যান্ড পল কেন্টাকির সিনেটর। একাধিকবার প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়িয়ে ব্যর্থ হওয়া রন পলের ছেলে তিনি। এছাড়াও শক্তিশালী বা হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে যারা নির্বাচনী মাঠে নামতে পারেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়রের ছেলে এবং আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ জুনিয়রের ভাই। জেব বুশ দীর্ঘ আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন ফ্লোরিডার গভর্নর হিসেবে। তবে অভিবাসনসহ বেশ কিছু সামাজিক ইস্যুতে উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি প্রাইমারীতে বেশ ঝঞ্ঝাটে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর হিলারির মতো ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হতে পারেন প্রভাবশালী নেতা ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং মেরিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর ও বাল্টিমোরের সাবেক মেয়র মার্টিন ও’মালে। ২০১৬ সালে বাইডেনের বয়স হবে ৭৩।
তবে বাকপটু ও সদা হাস্যোজ্জ্বল হিলারিই থাকছেন ফেভারিট হিসেবে। কারণ এখন আরো বেশি পরিপক্ক। স্বামী বিল ক্লিনটনের সাথে থেকে দু’দফা এবং বারাক ওবামার পাশাপাশি খুব কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে হিলারির। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন তিনি। ধারণা করা হয়, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজেকে তৈরি করতেই সময় নিয়েছেন হিলারি। তার প্রচারণা কমিটিও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। সেখানে থাকছেন ওবামার প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা।
এছাড়া হিলারি তাঁর প্রচারণায় সামনে আনছেন জনপ্রিয় সব প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে রয়েছে ধনী-গরীবের বৈষম্য দূর করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে ইমেইল কেলেঙ্কারি এবং লিবিয়ার বেনগাজীতে মার্কিন কনস্যুলেটে সন্ত্রাসী হামলায় তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে চলমান তদন্ত হিলারিকে ফেলে দিতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে। দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রাইমারীর দীর্ঘ প্রচারণা যুদ্ধে নামতে হবে তাঁকে। তবে আগেভাগে শুরু হওয়া নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং আইওয়া অঙ্গরাজ্যের প্রাইমারীর বিজয় তার জন্য শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সবারই একমত, হিলারির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে আশা এবং চ্যালেঞ্জ দুই’ই অত্যন্ত সমৃদ্ধ।