কেউ জিতছে না ইয়েমেনে!

ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের বিমান হামলার তিন সপ্তাহ হয়ে গেলেও এখনো পরিস্থিতির কোন অগ্রগতি ঘটেনি। সম্ভবত কোন পক্ষই এই যুদ্ধকে আর চালিয়ে যেতে চাইছে না। তবে সঙ্গত কারণেই কেউ আগ বাড়িয়ে লড়াইয়ের সমাপ্তিও ঘোষণা করতে পারছে না। এই যুদ্ধে প্রতিদিনই রক্তপাতের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কারোই কোন অর্জন নেই।
 
হুতি বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট আব্দুর রব মানসুর হাদিকে দেশত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে অশান্তির আগুন জ্বেলেছিলো আর প্রতিনিয়ত সেই আগুনে পুড়ছে হুতিদের আশ্রয়স্থল। আরব জোটের বিমান হামলার মধ্যে হুতিরা দেশটির উত্তরাঞ্চলে পিছু হটলেও তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না আরব জোট। যদিও সেখানেও হুতিদের নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই। হুতিদের শক্তিশালী ঘাঁটি সাদাও এখন হয়ে উঠেছে বিপদসংকুল। অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীরা যাতে কোনভাবে সৌদি আরবকে অস্থিতিশীল করে তুলতে না পারে সে জন্য সৌদি আরব তাদের সীমান্তে আরো বেশি শক্তি মোতায়েন করেছে। সীমান্ত এলাকায় অধিকতর কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।
 
হুতি বিদ্রোহীরা পিছু হটে আশ্রয় নেয়া শহরগুলোর বেসামরিক লোকদের মাঝে মিশে যেতে না পারলে কিংবা এই যুদ্ধে তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতা আদায় করতে না পারলে তাদের টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়বে। হুতি বিদ্রোহীরা যে শুধু সামরিক যুদ্ধেই পরাজিত হবে তাই নয় রাজনৈতিকভাবেও তারা ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বহির্বিশ্বে হুতিদের রাজনৈতিক অবস্থা বেশ জটিলভাবেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল হুতিদের আক্রমণকারী হিসাবে আখ্যায়িত করায় এবং তাদের নেতাদের ওপর অধিকতর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় হুতিদের রাজনৈতিক অবস্থা বেশ সঙ্কটময় হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনে ক্ষমতা দখলকারী হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি ক্ষমতা ছাড়ারও আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে গৃহবন্দী প্রেসিডেন্ট আব্দু রাব্বু মানসুর হাদির মুক্তি এবং সংকট সমাধানে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত একটি প্রস্তাবে এ আহ্বান জানানো হয়। যুক্তরাজ্য ও জর্ডান এ খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করে।
 
 
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে জর্ডানের পেশ করা এক প্রস্তাবনার আওতায় হুতি বিদোহীদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো ছাড়াও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য দেশ এ প্রস্তাবকে সমর্থন করলেও রাশিয়া করেনি। যদিও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা তাদের ওপর নিরাপত্তা পরিষদের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই সঙ্গে এর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভেরও ডাক দিয়েছে তারা। হুতিদের ‘সুপ্রিম রেভ্যুলুশনারি কমিটি’ এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবনাকে ‘আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে। হুতিদের মিত্র ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর অবস্থাও বেশ নাজুক। তিনিও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তার অনুগত সেনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ইউনিটগুলোও বেকায়দায় রয়েছে।
 
ইয়েমেনের এমন পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বেশ জমে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরান সমর্থিত ইরাকি যোদ্ধাদের সহায়তা করছে কিন্তু ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতিদের পরিবর্তে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটকে সহায়তা করছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি বলেছেন, ইয়েমেনের লড়াই আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাত বন্ধ করতে হবে।
 
এদিকে ইয়েমেনে নিযুক্ত জাতিসংঘের শান্তিদূত জামাল বেনোমার পদত্যাগ করেছেন। সংঘাতপূর্ণ ইয়েমেনে তার মিশনের ব্যাপারে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন হারানোর পর তিনি পদত্যাগ করলেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইয়েমেনে সংঘাতের অবসানে দ্রুত শান্তি আলোচনা শুরুর আহবান জানানোর প্রস্তাব করার মধ্যেই বেনোমার পদত্যাগ করলেন। ফলে জাতিসংঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলেই অনুমান করা যায়। যদিও জাতিসংঘে ইয়েমেনের জন্য চার দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেন, ইয়েমেনে যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রবিরতি ও সব বিদেশি সামরিক হামলা বন্ধ, মানবিক ত্রাণ সহায়তা, বন্ধ হয়ে যাওয়া জাতীয় সংলাপ আবার শুরু করা এবং এর ভিত্তিতে সব পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু ইয়েমেনের বিষয়ে ইরান কোন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নয় এই অজুহাতে ইরানের শান্তি আলোচনা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকরা।
 
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোট গত তিন সপ্তাহে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালালেও হুতি বিদ্রোহীদের দমনে তা তেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং সালেহর অনুগত বাহিনী ও হুতিরা রাজধানী সানাসহ দেশটির বেশিরভাগ শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। গত কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে শুধু মানুষের প্রাণহানিই ঘটেছে। প্রকৃত অর্থে উভয় পক্ষেরই অর্জন শূন্য।