একশন এইড বাংলাদেশের গবেষণার তথ্য

গৃহকাজের মূল্যায়ন না থাকায় পিছিয়ে পড়ছে নারী

কিশোরী সামিয়া ও তার ভাই সাব্বির লেখাপড়ায় ভালো। তবে সামিয়া প্রতিদিন ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করে, তারপর স্কুলের লেখাপড়া তৈরি করে সে স্কুলে যায়। ঘরের কাজ করে পড়ালেখা করায় প্রতিবছর সামিয়া পরীক্ষায় সাব্বিরের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। এতে বাবা-মায়ের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকে যখন সাব্বির বেশি নম্বর পেয়ে পাস করে তখন যথারীতি সাব্বিরের উচ্চতর শিক্ষায় জায়গা হয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেখানে সামিয়ার জায়গা হয় তার এলাকার একটি কলেজে। এরপর সাব্বির পাস করে একটি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হলেও সামিয়ার জায়গা হয় একটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে। বিয়ের পর সংসারের কাজের চাপ আর সন্তান লালন পালনে হিমশিম অবস্থায় তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। 

কেবল সামিয়া ও সাব্বির নয়। এমন বৈষম্যপূর্ণ চিত্র আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের। পরিবারে সময় দিতে গিয়ে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে শ্রমবাজারে। সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে            কাজ করা বিজ্ঞজনেরা বলছেন,  বাংলাদেশের নারীদের পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের মূল্যায়ন না থাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক একজন নারী গৃহস্থালি সেবামূলক কাজে সময় দেন প্রায় ৮ ঘণ্টা আর সেখানে একজন পুরুষ গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে সময় দেন মাত্র দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি। ফলে একজন নারী তার জীবনের প্রায় ১২ বছর সময় কাটান কেবল রান্নাঘরে। তারা বলছেন, বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে হলে বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতির অভাব নারী-পুরুষ বৈষম্যের অন্যতম মূল কারণ।

আর ঘরের  কাজ করতে গিয়ে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা ঘরের ওইসব কাজের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোনো মূল্যায়ন পান না। আর বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের কোনো আইন বা নীতিতে গৃহস্থালি সেবামূলক কাজকে শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়নি। অর্থনৈতিক কোনো পরিসংখ্যানেও এ কাজের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি রাষ্ট্রের বাজেট কিংবা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাপকাঠিতেও জিডিপিতে এর কাজের কোনো উল্লেখ বা স্বীকৃতি নেই। একশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি সময় ধরে ঘরের কাজ করছেন। এজন্য নারীরা সময় সংকুলানের চাপে পড়ছেন। ফলে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হতে পারছেন না তারা। মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েন। নিজের ক্ষমতায়ন আনতে পারেন না নারীরা। তাই নারীর এই বিষয়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত সচেতনতা দরকার।

একশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গৃহস্থালি কাজগুলোর মধ্যে পড়ে রান্না করা, সন্তান লালন-পালন করা, থালা-বাসন ধোয়া, কাপড় ধোয়া, ঘর-উঠান পরিষ্কার করা, জ্বালানি/লাকড়ি সংগ্রহ করা, পানি আনা, পরিবারের সদস্য-বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের সেবা করা। একশন এইড বাংলাদেশ ২০১১ সাল থেকে গৃহস্থালি সেবামূলক কাজ নিয়ে নানারকম কার্যক্রম ও গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমবাজার নারীর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘরের কাজগুলোকে কেউ কাজ হিসেবে দেখছে না। তাই ঘরের কাজ থেকে নারীর মুক্তি মিলছে না। ঘরের কাজ মানেই নারীর কাজ, এটা পুরুষ যেমন ভাবে, তেমনি নারীও এভাবেই ভাবছে। তিনি বলেন, অর্থনীতির মতো সময়টাকেও মূল্যায়ন করা উচিত।