মিয়ানমার থেকে নতুন করে আসা আর কোনো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেবে না বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এই কাউন্সিলকে জানাতে চাই যে, মিয়ানমার থেকে আসা নতুন কাউকে আর বাংলাদেশে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় মিয়ানমার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব ছিল ‘ফাঁকা বুলি’। এ বিষয়ে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে তারা। রাখাইনে নিরাপদে বসবাসের মতো পরিস্থিতি মিয়ানমার তৈরি না করায় একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হয়নি। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কি হতে পারে? নিরাপত্তা পরিষদের পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের উদ্যোগের অভাবের সমালোচনা করেন। তবে বরাবরের মতো মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে চীন ও রাশিয়া।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, নিজ দেশে বর্বরোচিত নৃশসংতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির স্বীকার রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তাদেরকে মানবিক আশ্রয় দেওয়ার জন্যই কী বাংলাদেশকে এই মূল্য দিতে হচ্ছে? বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত নানা সঙ্কটের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা-প্রণোদিত, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ব্যতীত আর কিছুই চাই না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আমরা নিরাপত্তা পরিষদের অব্যাহত অভিভাবকত্ব প্রত্যাশা করি। এ সময় নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার জন্য তিনটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে, কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত অসামরিক ‘সেফ জোন’ সৃষ্টির প্রস্তাব। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা-প্রণোদিত প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আরো কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের শিকড় মিয়ানমারেই প্রোথিত এবং মিয়ানমারের কাছেই সমাধান রয়েছে।
সভায় মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনার তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরের বিষয়ে ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, সঙ্কট সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ অত্যন্ত ধীরগতির হলেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সহযোগিতায় এ সঙ্কটের সমাধান সম্ভব হতে পারে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে মাত্রার নির্যাতন হয়েছে এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ রয়েছে তাতে এটা প্রমাণিত হয় যে, রোহিঙ্গা নির্যাতন এ শতাব্দীর সব থেকে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি না করতে পারায় হাতাশা ব্যক্ত করেন নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্যের দূত কারেন পিয়ার্স। রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এমন পরিবেশ অবশ্যই সেখানে নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী দূত জোনাথান কোহেন বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই পৃথিবীর সব থেকে বড় শরণার্থী শিবিরকে উপেক্ষা করতে পারেন না।
তবে জাতিসংঘে চীনের সহকারী দূত উ হাইতাও বলেন, এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের। তাই দ্বিক্ষীয়ভাবে এই সংকটের সমাধান করতে হবে। রুশ দূত দিমিত্রি পলিয়ানস্কি তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করেন। এদিকে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেসের সাথে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। দ্বি-পাক্ষিক এই বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি উঠে আসে রোহিঙ্গা বিষয়টি।