যুক্তরাজ্যে বাঙালি কমিউনিটি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে

 
যুক্তরাজ্যে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি দিনদিন এগিয়ে যাচ্ছে। বহুমুখী সম্প্রদায়-সংস্কৃতির এই দেশে বাঙালিরা শিক্ষা, ব্যবসা, রাজনীতি, প্রফেশনাল চাকরি বাজারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রজদের চেয়ে অনুজরা এখন উল্লেখযোগ্য হারে অগ্রগামী।
 
আর্থ-সামাজিক জরিপের প্রতিবেদনে গ্রেটব্রিটেনের টাওয়ার হ্যামলেটসকে দারিদ্র্য কবলিত বরো (Borough) বলা হয়েছে। এখানের ৫০ ভাগ শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। স্কুলগামী শিশুদের অন্তত ৩০ শতাংশের বেশি হতদরিদ্র সংসারের। পিতা-মাতার অভাবের ফলে স্কুলে তাদের ফ্রি মিল গ্রহণ করতে হয়। অধিকাংশ পরিবারের জীবন চলে সোস্যাল সিকিউরিটির আওতায়।
 
অবশ্য কমিউনিটির একাধিক নেতা ইত্তেফাককে বলেছেন, টাওয়ার হ্যামলেটস দারিদ্র্য পীড়িত চিহ্নিত হওয়ার পিছনের কারণ হচ্ছে- এখানে অনেকেই আছেন যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়েও নিজেকে কর্মহীন, স্বল্প আয় ও কর্মঅক্ষম দেখিয়ে সরকারি সাহায্যে চলছেন। আবার ব্যবসা-বাণিজ্য থাকলেও ট্যাক্স দিচ্ছেন না। এহেন অসৎ মনেবৃত্তি প্রবল।
 
মূলধারার সংবাদত্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজনের অসাধু কর্মকাণ্ডের খবর প্রায়েই প্রকাশ হচ্ছে। সম্প্রতি একজন মিলিয়নিয়ার ধনাট্য কমিউনিটি নেতা তার সম্পদ-আয় গোপন করে সপ্তাহে ১৩০ পাউন্ড সোশ্যাল বেনিফিট গ্রহণ করছেন মর্মে খবর প্রকাশ পেয়েছে।
 
তবু্ও গত বছর জিসিএসই পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীরা জিপি-৫ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যা জাতীয় গড় হারের চেয়ে ১৬ ভাগ বেশি।
 
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাঙালি কমিউনিটির লোকজন তাদের জাতিগোষ্ঠীর মাঝে ব্যবহারিক জীবনে ইংরেজি ভাষাকে উপেক্ষা করে তাদের আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মও আঞ্চলিক উচ্চারণে অভ্যস্থ।
 
তবে বাংলাদেশি কমিউনিটির সন্তানদের শিক্ষায় চমত্কার সাফল্য যুক্তরাজ্যে জাতীয়  পর্যায়ে নানা আলোচনায় উঠে আসছে এবং দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি তারা অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় মেধার ভিত্তিতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
 
এক্ষেত্রে চীন, জাপান, মালয়েসিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতীয়দের তুলনায় কম হলেও এশিয়ার অন্যদের তুলনায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
 
বর্তমান সেশনে অক্সফোর্ডে ২৭ জন এবং ক্যামব্রিজে অধ্যায়ন করছেন ৩২ জন বাংলাদেশি ছেলে-মেয়ে। তবে এ হিসাব আঞ্চলিক ভিত্তিতে নয়। 
 
ব্রিটেনের প্রভাবশালি ম্যাগাজিন দ্য ইকোনোমিস্ট সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্রিটেনে  আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন-অগ্রগতিতে পাকিস্তানিদের চেয়ে বাংলাদেশিরা অনেক এগিয়ে।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- পাকিস্তানি কমিউনিটি লন্ডনের ব্রাডফোর্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বাংরাদেশিরা টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায়। এই দু‘এলাকার তুলনামূলক আর্থ-সামাজিক চিত্রে বাংলাদেশি কমিউনিটি টাওয়ার হ্যামলেটসে অনেক দূর এগিয়ে রয়েছে।
 
বিবিসি‘র হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেন্টারিতে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে- দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে অংশ নেয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে তুলনামূলকভাবে উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি  ব্রিটেনের বন্ধু হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই শহীদ হয়েছেন।
 
লন্ডনে বিশ্ব যুদ্ধের স্মরণ স্তম্ভে অনেক বাঙালির নাম অঙ্কিত রয়েছে। বাঙালি কমিউনিটির লোকজন তাদের নাম না জানলেও মূলধারার ব্রিটিশ জনগণ তাদের প্রতিবছর স্তম্ভে ফুল দিয়ে স্মরণ করেন। টাওয়ার ব্রিজের কাছে একটি স্তম্ভে অন্তত ১৯ জনের নাম রয়েছে। এরা সকলেই বেঙ্গল (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে যুদ্ধে অংশ নেন এবং বিভিন্ন দেশে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধরত অবস্থায় ব্রিটেনে প্রবেশ করেন। তারা জার্মানি-ফ্রান্সের হামলায় নিহত হন বলে স্তম্ভে উল্লেখ আছে।
 
লন্ডনে বাঙালি অভিবাসনের ইতিহাসে এটি একটি মাইল ফলক। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ দশক থেকেই বাঙালি অভিবাসি ব্রিটেনে বাড়তে থাকে।
 
বিবিসি‘র আর্কাইভে সংরক্ষিত ডকুমেন্সে আরো বলা হয়েছে ব্রিটেনে প্রথমে বাঙালিরা গ্লোচেস্টার সায়েরে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ৯০ ভাগ সিলেটে অঞ্চলের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
অবশ্য  প্রভাবশালি  দৈনিক গার্ডিয়ানের তথ্যে বলা হয়েছে বাংলাদেশিদের ৯৫ ভাগ সিলেট এলাকার। এতে আরো বলা হয়, ১৯৪৬ সালে ছোট আকারে মাত্র ২০টি বাঙালি রেঁস্তরা ছিল। ১৯৬০ সালে বেড়ে তা ৩ শ।  ১৯৮০ সালে ৩ হাজার এবং বর্তমানে ১২ হাজারের বেশি। এর ৯০ ভাগের মালিক বাংলাদেশিরা। লন্ডনের সবচেয়ে দরিদ্র কবলিত টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বাসিন্দা বাংলাদেশি।
 
দ্য গার্ডিয়ানের হিস্ট্রিক্যাল তথ্যে আরো বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম দারিদ্র্য তাড়িত দেশ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বাঙালিরা ইকোনমিক্যাল অভিবাসী হিসেবে লন্ডনে এসেছিল। এই হত দারিদ্র্য মানুষগুলো লন্ডনে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই গর্ববোধে এগিয়ে যাচ্ছে। বলা হয়, ১৯৭০-’৮০ ’র দশকে ১০-১২ বছর বয়সে যারা লন্ডনে এসেছেন তাদের অনেকেই এখন মাল্টিমিলিয়নিয়ার।