অ্যাপস নিয়ে স্বপ্নের দেশে

যখন থেকে প্রযুক্তি সম্পর্কে বুঝতে শুরু করেছি তখন থেকেই গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপলের মতো শীর্ষস্থানীয় সব প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেছে। গোটা বিশ্বকে শাসন করা প্রযুক্তি পণ্য ও সেবাগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠানে কীভাবে তৈরি করা হয় বা ডিজাইন করা হয়, তা একবারের জন্য হলেও দেখার একটা ইচ্ছা জন্ম হয় মনের মধ্যে। সেই সুযোগ যে এত তাড়াতাড়িই পেয়ে যাব, ভাবতে পারিনি আগে।
 
প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই ২০১৩ সালে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরেই যোগ দিই শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাইক্রোসফটের প্রোগ্রাম ‘মাইক্রোসফট স্টুডেন্ট পার্টনার’ (এমএসপি) প্রোগ্রামে। এক বছর মাইক্রোসফট কমিউনিটি ও এমএসপি সোশ্যাল মিডিয়া লিড হিসেবে কাজ করার পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাইক্রোসফটে যোগ দিই মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট হিসেবে।
 
মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট হলো এমন একটি দল যারা মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক টিমকে অনলাইন (ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম আর লিংকডইন) ও অফলাইনে তরুণ সমাজকে পরিবর্তনে সাহায্য করে। ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট টিমে যুক্ত হওয়ার ঘটনাটা একটু ভিন্ন। ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেত হয় না। মাইক্রোসফটের বিভিন্ন প্রোগ্রামে যারা কাজ করেছে তাদের পারফর্ম্যান্স এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই মূলত ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট বাছাই করা হয়ে থাকে।
 
প্রথমবার বাছাই পর্বে ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমার নাম আসে ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেটদের অফিশিয়াল লিস্টে। শুরু করি সোস্যাল শেয়ারিং, অনলাইন/অফলাইন ইভেন্ট। প্রথমে ছিলাম একজন সাধারণ অ্যাডভোকেট। প্রায় দুই মাস পর আমার নাম উঠে যায় টপ লিস্টে। পরের মাসে উন্নতি হয় অলটাইম অ্যাডভোকেট হিসেবে। সারাবিশ্ব থেকে শত শত অ্যাডভোকেটদের মধ্যে মাত্র ২১ জনকে নিয়ে তৈরি হয় অলটাইম অ্যাডভোকেট গ্রুপ।
 
ধীরে ধীরে আমাদের এই ২১ জনকেই নিয়ে তৈরি হয় অ্যাডভোকেট রকস্টার কাউন্সিল গ্রুপ, যেখানে আমরা বর্তমান আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতাম। ধীরগতিতে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকি। এর মধ্যেই মাইক্রোসফট ৯ জন আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেটকে সিয়াটল, ওয়াশিংটনে অবস্থিত মাইক্রোসফট কর্পোরেশনে আমন্ত্রণ জানাবে বলে খবর আসে। ‘দ্য উই ডে’ নামের একটি সোস্যাল প্রোগ্রামে মাইক্রোসফটের সাথে কাজ করার জন্যই এই আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানতে পারি। মাইক্রোসফট পরিদর্শনের স্বপ্নটিও চলে আসে কাছাকাছি।
 
‘দ্য উই ডে’ হলো একটি সোশ্যাল প্রোগ্রাম, যেখানে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী আসে নিজেকে, বিশ্বকে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে। ২ মার্চ রাতে ফেসবুকে একটি নোটিফিকেশন পাই। মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্কের অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপে একটি ভিডিও আপলোড করে মাইক্রোসফট, যেখানে সেই নয় জনের নাম উল্লেখ করা হয়। চালু করলাম ভিডিওটি। ঠিক ঠিক নয়টি নামের মধ্যে খুঁজে পেলাম নিজের নামটি। আমার সাথে বাংলাদেশ থেকে কাজী মামুন নামে আরও একজন অ্যাডভোকেটও আমন্ত্রণ পান মাইক্রোসফটের এই কর্মসূচিতে। বাংলাদেশ ছাড়া বাকি সাত জনকে নির্বাচন করা হয় ভারত, নেপাল, নাইজেরিয়া, কানাডা, পেরু, কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। এই নয় জনের যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া, ভিসা ফি—এর সবই মাইক্রোসফট বহন করবে জানিয়ে একটি চিঠি ডাকযোগে আসে মাইক্রোসফট থেকে। মাইক্রোসফট বাংলাদেশকেও যথারীতি অবহিত করা হয়। মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সোনিয়া বশির কবির এবং টেকনিক্যাল ইভাঞ্জেলিস্ট তানজিম সাকিব আমাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের অফিশিয়াল ডক্যুমেন্ট দিয়ে সর্বোতভাবে সহায়তা করেন।
 
দেখতে দেখতে ভিসা হয়ে যায়। মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে পাঠানো বিমান টিকেটও চলে আসে হাতে। অবশেষে সব ধরনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে ২০ এপ্রিল। রাতের ফ্লাইটে প্রাথমিক গন্তব্য আরব আমিরাতের দুবাই এয়ারপোর্ট। সেখানে বাকি সাত জনের পাঁচজন পৌঁছে যাবে কাছাকাছি সময়ে। সাত জন মিলে সেখান থেকে চড়তে হবে সিয়াটলের ফ্লাইটে। দুবাই এয়ারপোর্টে ৮ ঘণ্টার ট্রানজিট শেষে চড়লাম সিয়াটলের ফ্লাইটে। লম্বা ভ্রমণের শেষে ২১ এপ্রিল বিকালে পৌঁছলাম সিয়াটলে। বিমানবন্দর থেকে আমাদের হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি রেডি ছিল এয়ারপোর্টেই।  আমাদের থেকে বের হয়ে দেখি একটি গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদেরকে হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শুরু হলো হোটেল যাত্রা। সিয়াটলের বিখ্যাত ‘স্পেস নিডল’ টাওয়ারের কাছেই আমাদের হোটেল। বিস্ময় নিয়ে পৌঁছলাম হোটেলে, সাথে উত্তেজনা। রাতটা পার করলেই পরদিন সকালে আমার স্বপ্নের মাইক্রোসফটের সদরদপ্তর!
 
হোটেল থেকে মাইক্রোসফটের অফিস আধা ঘণ্টার রাস্তা। সকাল সকাল রওনা দিয়ে পৌঁছে গেলাম মাইক্রোসফটের অফিসে। ৩২ নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনে গাড়ি থেকে নেমে মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্কের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডিনা ম্যাডামের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম ৩৩ নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনে। এই বিল্ডিংয়ে রয়েছে মাইক্রোসফটের কনফারেন্স আর ফিউচার এক্সপেরিয়েন্স রুম। স্কাইপ রুমের অন্যদিকে ফিউচার এক্সপেরিয়েন্স রুম। মোবাইল, ক্যামেরা—সবকিছু রেখে ঢুকলাম রুমে।
 
সে যেন এক স্বপ্নের রুম! এখানকার সবকিছুই ভার্চুয়াল। নানা ধরনের সেন্সরে যেন ভর্তি রুমটা। কাইনেক্ট থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু দেখলাম, যার কিছু কিছু চিনিই না! ঘণ্টা দুয়েক সেই রুমে কাটিয়ে বের হলাম মাইক্রোসফট ঘুরে দেখতে। একটার পর একটা বিল্ডিং দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছিল সময়।
 
এরপর মাইক্রোসফটের ভিজিটর সেন্টারে শপিংয়ের পালা। শুরু হলো কেনাকাটা, এর খরচও মাইক্রোসফটের! দুপুর তিনটা পর্যন্ত ঘুরে-ফিরে পৌঁছলাম মাইক্রোসফটের খাবার-ঘরে। নানা পদের মেন্যু থেকে যার যার পছন্দমতো সেরে ফেললাম খাওয়ার ঝামেলা।
 
এরপর দেখা করার পালা মাইক্রোসফট ইউনিভার্সিটি রিক্রট টিমের সাথে। ৫টার দিকে আমরা পৌঁছলাম ইউনিভার্সিটি রিক্রুট টিমের বিল্ডিংয়ে। আমাদের অবাক করে দিতে আমাদের জন্য উপহার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন রিক্রুট টিমের সদস্যরা। আমাদের প্রত্যেককেই সিভি নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল, যাতে করে টিমটির সদস্যরা আমাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে পারে। খুব ভালো একটি সম্পর্ক তৈরি হয় তাদের সাথে। ওখানেই একটি রুমে রয়েছে মাইক্রোসফটের বিশাল এক লোগো, যাতে বিভিন্ন দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় আর এখানে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থীদের নাম লেখা। এই সুযোগ বাংলাদেশের নামের সাথে নিজের নামটিও লিখে দিলাম সেখানে।
 
আধা ঘণ্টা পরে আমরা গেলাম যায় মাইক্রোসফট স্টোরে। সেখানে মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেটদের নিয়ে যাওয়া হয় ‘We Day’ প্রোগ্রামের প্রস্তুতির জন্য। আমরা ৯ জনসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ জন ইয়ুথস্পার্কদের নিয়ে শুরু হয় প্রস্তুতি। সেখানে ওই দিনের মতো প্রস্তুতি শেষ করে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা।
 
পরের দিন স্পেস নিডলের ঠিক সাথেই ‘কিঅ্যারেনা’তে অনুষ্ঠিত হলো আমাদের প্রতীক্ষিত ‘উই ডে সিয়াটল ২০১৫’। সকালে উঠে সকল অফিশিয়াল কাজ-তর্ম শেষে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাই কিঅ্যারেনাতে। হাজারো তরুণ-তরুণী তখন রাস্তায় দাঁড়ানো, উন্মুক্ত হয়নি প্রবেশের সুযোগ। মাইক্রোসফট সিটিজেনশিপ টিমের সাথে আমরাই প্রথমে প্রবেশ করলাম কিঅ্যারেনাতে।
 
উই ডে’তে সোস্যাল মিডিয়ার কাজ করার জন্য আমাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় একটি করে উইন্ডোজ ফোন আর পাওয়ার ব্যাংক। সকাল ৯টায় শুরু হয় উই ডে’র কার্যক্রম। একে একে সেই সব তরুণ-তরুণীরা আসছে যারা সবচেয়ে অল্প বয়সে নিজেকে আর বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পেরেছে। এত মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম পুরো এলাকা। ৩টা পর্যন্ত চলে এমন তারুণ্যের মেলা।
 
৫টার দিকে মাইক্রোসফটে আমাদের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সকলকে নিয়ে সিয়াটল ঘুরতে বের হন। হেঁটে হেঁটেই সিয়াটলের সবচেয়ে বড় মার্কেট, সি-বিচ, খাবার রেস্টুরেন্ট ঘোরা হয়ে গেল। এদিনও হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা।
 
পরদিন, ২৪ এপ্রিল, ছিল ফেরার দিন। কেউ কেউ দুয়েকদিনের জন্য সিয়াটলে থেকে গেলেও আমরা বেশিরভাগই ওই দিন বিদায় নিই সিয়াটল থেকে। আমি অবশ্য রওনা দিই নিউইয়র্কের পথে। নিউইয়র্কের মাইক্রোসফট অফিসও ঘোরা হয়ে যায় এই সুযোগে। ২৯ এপ্রিল নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দর থেকে রওনা দেওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় আমার স্বপ্নের আশ্চর্য ভ্রমণ।
 
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে