সদরঘাট নদীবন্দরের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরের গুরুত্ব অনেক বেশি। এইসব বন্দর যোগাযোগের ক্ষেত্রে নূতন নূতন দিগন্ত উন্মোচন করে। সদরঘাট ঢাকার নদীবন্দর হিসাবে পরিচিত। সেই ১৯৬০ সালে সরকারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইহাকে ঢাকা নদীবন্দর হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ইহা ঢাকার সহিত, বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হইয়া উঠিয়াছে। প্রায় চারশত বত্সর আগে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরেই গোড়াপত্তন হয় প্রাচীন ঢাকা নগরীর। সেই হিসাবে সদরঘাটের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রহিয়াছে। তাহাছাড়া এই নদীবন্দরের মাধ্যমেই প্রতিদিন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৬ জেলার লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করেন। সরকারি ছুটি, ঈদ উত্সব ও পূজা-পার্বণসহ নানা উত্সব ও অবকাশ যাপনের সময় এই সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থায় সদরঘাটের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন সকলেরই প্রত্যাশিত।

বাংলাদেশ আয়তনের দিক হইতে একটি ছোট্ট দেশ। সম্পদও সীমিত। কিন্তু সেই অনুপাতে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সমস্যার সমাধান চাহিলেও সম্ভব হইয়া ওঠে না। এই অবস্থায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করিয়া চলিবার বিশেষ কৌশল অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নাই। এইক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়নের অগ্রাধিকারের খাতগুলি চিহ্নিত করা দরকার। তন্মধ্যে যোগাযোগ খাত হিসাবে বন্দরগুলির উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। সদরঘাটের প্রধান প্রধান সমস্যা হইল— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, যাত্রী হয়রানি, আশেপাশে ভয়াবহ যানজট, অপর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, মূল চ্যানেলের সংকোচন ইত্যাদি। ইহার মধ্যে কিছু সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান করা হইয়াছে। যেমন— সদরঘাট টার্মিনাল এলাকার চিরচেনা দৃশ্য হকার, চাঁদাবাজ, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির দৌরাত্ম্য ও কুলিদের হয়রানি বহুলাংশে দূর করা সম্ভব হইয়াছে। নদীবন্দরে তৈরি করা হইয়াছে দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। তবে যানজট সমস্যার সমাধানে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেননা এই কারণে অনেকে ঠিকসময়ে সদরঘাটে আসিয়া পৌঁছাইতে পারেন না।

যানজট নিরসনে পোস্তগোলা, শ্মশানঘাট ও বাবুবাজার ব্রিজ হইয়া বাদামতলী দিয়া সদরঘাট টার্মিনাল অভিমুখী মূল রাস্তায় সবজি, ফলের আড়ত ও ভাসমান চায়ের দোকানগুলি আগে উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন গুলিস্তান হইতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণসহ ফ্লাইওভারের একটি লুপ বাবুবাজার ব্রিজ ও অপর একটি লুপ গোস্তগোলা ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত করা। শ্যামবাজার ও বাদামতলী এলাকায় সবজি ও ফলের আড়ত অন্যত্র স্থানান্তর করা এবং সিটি করপোরেশনের টিনশেড মার্কেটটি অপসারণপূর্বক চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ হইতে সদরঘাট অভিমুখী রাস্তাটি দুই লেনে উন্নীত করাও দরকার। দরকার ওয়াইজঘাট ও বাদামতলী এলাকায় প্রস্তাবিত পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদী দূষণের পথ বন্ধ ও তীরবর্তী সকল অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা, নৌদুর্ঘটনা বন্ধে টার্মিনাল ভবনসংলগ্ন তিনটি খেয়াঘাট পটুয়াখালী ঘাটের পশ্চিম পার্শ্বে স্থানান্তর করা এবং বুড়িগঙ্গা নদী পারাপারে একাধিক টানেল নির্মাণ করা। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা নদী তীরে গড়িয়া উঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন ও তাহার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। ইতোমধ্যে এই সংক্রান্ত অনেক পরিকল্পনাই প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হইয়াছে। এখন তাহার দ্রুত বাস্তবায়ন কাম্য। এইসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হইলে সদরঘাটের চিত্র অনেকটাই বদলাইয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়।