মা ন ব পা চা র

কোথাও আশ্রয় পাচ্ছে না সাগরে ভাসা মানুষ

সাগরের বুকে নৌকায় ভেসে থাকা বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সরকার এসব নৌকাকে তীরে ভিড়তে না দেয়ার নীতি গ্রহণ করায় ভাসমান এসব মানুষের জীবন ও ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রায় আট শতাধিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে বহনকারী দুইটি নৌকাকে সমুদ্রে ফেরত পাঠিয়ে দেয় মালয়েশিয়া। তারপর থেকে যাত্রীদের নিয়ে চক্কর খাচ্ছে নৌকা দুইটি উত্তাল সাগরের বুকে। একটু ভালো কাজ পাওয়ার আশায় মানুষগুলো মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিল।

 
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংগঠন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডকে এসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ করেছে। আর থাইল্যান্ডে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে আটক অবৈধ অভিবাসীদেরকে। খবর: এপি, রয়টার্স ও ব্যাংকক পোস্টের।
 
গ্রেফতার এড়াতে বহু আগেই মানব পাচার চক্রের সদস্যরা নৌকা ছেড়ে চলে গেছে। নৌযানগুলো এখন নাবিকবিহীন। এসব নৌকায় পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নেই। গাদাগাদি করে থাকা এসব মানুষের অনেকেই অসুস্থ। এক হিসাবে বলা হচ্ছে, মালাক্কা প্রণালী ও আন্দামান সাগরে গত প্রায় দুই মাস ধরে ভেসে চলেছে আট হাজারের মতো রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি। এ অবস্থায় গত বুধবার একটি নৌকাকে মালয়েশিয়ার জলসীমায় দেখা গেলেও তাদের থামানো হয়নি। আর গতকাল দুটি নৌকাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।
 
এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার ডেপুটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ান জুনাইদি জাফর বলেন, যারা আমাদের সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের সঙ্গে আমরা ভালো ব্যবহার করে এসেছি। কিন্তু তারা সমুদ্র সৈকতে এভাবে দলে দলে আসতে পারে না। তিনি বলেন, আমাদের সঠিক বার্তা পাঠাতে হবে যে, তাদের এখানে স্বাগত জানানো হবে না। মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান অ্যাডমিরাল তান কো কো কিউ রয়টার্সকে বলেন, আমরা আর তাদের সুযোগ দিচ্ছি না। এটি রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত।
 
মালয়েশিয়ার সমুদ্র তীরে ৮০০ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাবাহী নৌকাকে ভিড়তে না দেয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউএনএইচসিআর। মালয়েশিয়ায় সংস্থাটির প্রতিনিধি রিচার্ড টোলে বলেন, এসব নৌকায় অনাহারী মানুষ রয়েছে। অনেকের জরুরি ভিত্তিতে চিকিত্সা প্রয়োজন। এসব মানুষের জীবন বাঁচানো প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ অঞ্চলের দেশগুলোর একযোগে এ দায়িত্ব পালন করা উচিত।
 
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বহনকারী নৌকাগুলো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ফেরত পাঠানো বন্ধ করা উচিত। তাদের তীরে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ ও চিকিত্সা সেবা দেয়া উচিত। গতকাল এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। এদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন চালানোর মাধ্যমে এ সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি-পরিচালক ফিল রবার্টসন।
 
এসব অভিবাসীর কাছে পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা স্যালাইন কিছুই না থাকার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিল রবার্টসন বলেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষ নৌকার অভিবাসীদের ফিরিয়ে দেয়ার নীতি গ্রহণ করে সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করেছে। তিন দেশের নৌবাহিনীর উচিত ত্রিমুখী মানব পিং-পং খেলা বন্ধ করা। অন্য দেশের সরকারসমূহের উচিত এই তিন সরকারকে এসব মানুষ উদ্ধারের আহ্বান জানানো। মালয়েশিয়ান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সুনাই পাহসুক রয়টার্সকে বলেন, দেশগুলো যদি পুশব্যাক নীতি নিয়ে এগোতে থাকে, তবে তাদের হাতে সাধারণ মানুষের রক্তের গন্ধ লেগে থাকবে। যদিও ইতিমধ্যে প্রায় দুই হাজার মানুষকে সীমান্ত থেকে উদ্ধার করেছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
 
এদিকে, থাইল্যান্ডে আটক দুই শতাধিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। বৃহস্পতিবার থাই পুলিশের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে এ কথা বলা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় এক গভীর জঙ্গলে ‘গণকবরের’ সন্ধান পাওয়ার পর দেশটিতে মানব পাচারবিরোধী অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই প্রেক্ষাপটে গত প্রায় ১৫ দিনে আড়াই শতাধিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা আটক হয়েছে। পুলিশ এরই মধ্যে ১৮৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। এবার এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। আটক অন্যদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের পেদাং বেসার এলাকার খাও কেউ পাহাড়ের আশেপাশে বুধবার অবৈধভাবে গমনেচ্ছুদের আরো চারটি কবরের সন্ধান মিলেছে। সেখান থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এছাড়া থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমায় একটি নৌকায় ১০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে বলে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে।
 
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি পাচারের শিকার হয়েছেন। যাত্রা পথে মারা গেছেন তিন শতাধিক। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, ৮ হাজারের মতো মানুষ এখন সাগরে ভাসছে।
 
৪১ দালালের বিরুদ্ধে মামলা
 
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, মঙ্গলবার বিকালে বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার পাওয়া ১১৬ মালয়েশিয়াগামী যাত্রীকে বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় সাবরাং কচুবনিয়ার দালাল মো. গুরা মিয়াকে প্রধান আসামি করে ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে। বুধবার গভীর রাতে সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার ফিরোজ আহাম্মদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মো. কবির হোসেন জানান, আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফের ১৮ জন, কক্সবাজার-রামুর ৮, উখিয়া-ইনানীর ৫, নরসিংদীর ৩, পাবনার ১, রায়পুরের ২, কিশোরগঞ্জের ২ ও সিরাজগঞ্জের ২ জন রয়েছেন।
 

প্রসঙ্গত, কোস্টগার্ড সদস্যরা সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় মালয়েশিয়াগামী একটি থাই ট্রলার থেকে ১১৬ যাত্রীকে উদ্ধার করে। ট্রলারটি বর্তমানে শাহপরীর দ্বীপ গোলারচরে ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে।