মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় মানবপাচার

সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ মানব-পাচারের শিকার অধিকাংশই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন ‘ঠিকানাবিহীন’ এসব রোহিঙ্গা। রাষ্ট্র কর্তৃক নির্যাতিত রোহিঙ্গা সম্প্রদারের মানুষ নিরুপায় হয়ে বাঙালি পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। রোহিঙ্গাদের দেখাদেখি কিছু বাংলাদেশিও ‘পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন’ মানবপাচার কার্যক্রমে উত্সাহিত হয়েছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই মানবপাচারে সম্পৃক্ত। মানবপাচারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে আসছে মিয়ানমারের কোস্টগার্ড। থাইল্যান্ডের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত দুই বছর যাবত্ সমুদ্রপথে অবৈধ অনুপ্রবেশ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে আরাকানে রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতন তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করে। ওই সুযোগে ফুসলিয়ে দালাল ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে ছেড়ে দেয়। নৌ-পথে কোস্টগার্ডের সদস্যদের প্রহরায় থাই সীমান্তে নিয়ে আসা হয় মানবপাচারকারীদের। অনেক সময় থাইল্যান্ডের বোটগুলো মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের কাছে আগে থেকে সংরক্ষিত থাকতো বলে বোটগুলোয় অবস্থান করা একাধিক যাত্রী  জানিয়েছেন। মিয়ানমারের প্রশাসন তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় সামিল হওয়ার জন্য উত্সাহ দিতো। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কঠোর হওয়ায় বিপাকে পড়ে সমুদ্রপথে ভাসমান অবৈধ অভিবাসীরা। মিয়ানমারের প্রশাসনই রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ইতিমধ্যে সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কথা বললেও নিশ্চুপ রয়েছে মিয়ানমার সরকার।
 
ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাগরপথে মানবপাচারকারীদের মূল গন্তব্য মালয়েশিয়া। থাইল্যান্ডের সঙ্খলা প্রদেশের সীমান্ত বা নৌ-পথ দিয়ে মালয়েশিয়ায় অনুপ্রবেশ করতো সমুদ্রপথে পাড়ি দেয়া অবৈধ অভিবাসীরা। কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়ায় তারা সমুদ্রপথ ত্যাগ করে স্থল সীমান্তে প্রবেশ করতে পারছে না। কোনমতে যেসব অবৈধ অভিবাসী সঙ্খলা সীমান্তে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল, তাদের নিয়ে বিপাকে পড়ে দালাল ও মানবপাচারকারীরা। কারণ মালয়েশিয়ায় কড়াকড়ি হওয়ায় ঠিকানাবিহীন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোও সম্ভব হচ্ছিল না। যার ফলে সঙ্খলা জঙ্গলে সন্ধান মেলে বেশকিছু গণকবরের।
 
সঙ্খলায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী একাধিক বাসিন্দা জানান, সঙ্খলায় চলে আসছে অবৈধ অভিবাসীদের ‘হাতবদল’ বাজার। স্থানীয়দের সহযোগিতায় সাগরপথে থাইল্যান্ডে আসা অবৈধ অভিবাসীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হতো। এখানে রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করে আসছে। যারা নানাভাবে অবৈধ রোহিঙ্গা অভিবাসীদের মালয়েশিয়ায় ঢুকতে সাহায্য করতো। পত্রপত্রিকায় অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশি বলা হলেও আসলে ওরা বাঙালি নন, বাংলা ভাষা-ভাষী রোহিঙ্গা। স্থানীয়রা জানান, একশ’জন রোহিঙ্গার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালি পাওয়া যায়। তবে যারা রোহিঙ্গা তাদের অনেকে নিজেদের বাঙালি পরিচয় দিয়ে থাকেন। বাস্তবে সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে যতটা না বাংলাদেশি তার কয়েকগুন বেশি রোহিঙ্গা।
 
জঙ্গলে নয়, সমুদ্রে ভাসছে অনুপ্রবেশকারীরা
 
থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে সমুদ্রে ভাসছে কয়েক হাজার অনুপ্রবেশকারী। সঙ্খলা জঙ্গলে ঠাঁই না পেয়ে সমুদ্রে নৌকায় অবস্থান নিয়েছে অবৈধ অভিবাসীরা। আন্দামান সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যন্ড ও মালয়েশিয়া সরকারও। খাবার ও পানির অভাবে চরম দুর্ভোগে রয়েছে এসব মানুষ।
 

গত ১ মে থাইল্যান্ডে মানবপাচারের শিকার হওয়াদের গণকবর পাওয়ার পর পাচারবিরোধী বড় অভিযান শুরু করে থাই কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে সঙ্খলার মেয়রসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গত ৭ মে থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল পুলিশের প্রধান সোমইয়োত পোম্পানমং জানান, পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে মানবপাচারকারীদের ধরার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর থেকে গ্রেফতার ও আত্মসমর্পণ কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যন্ত অর্ধ-শতাধিক ব্যক্তি আইনের আওতায় এসেছে।