জাতীয় বাজেট এবং নারী


আসছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের বাজেট নিয়ে প্রায় সব শ্রেণির জনগণের আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকে। সকল জায়গায় যুগোপযোগী বাজেটের পরিমাণ নিয়েও থাকে আলোচনা, সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সে ক্ষেত্রে অবশ্য বেশ শোরগোল থাকে নারী উন্নয়নের বাজেট নিয়েও। কারণ দেশের নারী উন্নয়ন বাদ দিয়ে সার্বিক উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। তাই এবারের

বাজেটে নারী উন্নয়নে যুগোপযোগী একটি বাজেট চায় নারীরা। জানাচ্ছেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক

‘ক্ষমতায়ন ও জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নারীর অংশগ্রহণের পথে যে সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা রোধে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করার জন্য উপবৃত্তির পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন ও পরিবহনের সুবিধা প্রদান এবং চাকরিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তথ্য ও  প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নারীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ, স্বাস্থ্য ও উদ্যোক্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আবশ্যক।  নারীর উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, স্থানীয় সরকার পানি ও বিদ্যুত্ ও জ্বালনি, জনপ্রশাসন এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে নারীর উন্নয়ন করাটা জরুরি। তাই ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করা এবং যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করতে বাজেট ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করা দরকার। আর এর সঠিক সমাধানের জন্য অন্তত ১৩ শতাংশ বাজেট ছাড়া কখনো সম্ভব নয়’ এমনটাই মনে করছেন নারীরা। একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে অর্থনীতি। আর অর্থনীতির বাত্সরিক দিকনির্দেশনা বলা যায় বাজেটকে। আসন্ন বাজেটকে ঘিরে তাই জনমনে চলছে নানা উদ্দীপনা ও আকাঙ্ক্ষা। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষই কম-বেশি বাজেট নিয়ে ভাবছেন। ভাবছেন গৃহিণীরাও যারা ঘরের বাজেট সামলাচ্ছেন, তাদেরও নজর আটকে আছে জাতীয় বাজেটের দিকে।

 

বাজেট নিয়ে গৃহিণীদের ভাবনা

আসমা আক্তার একজন গৃহিণী। থাকেন ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে। আসন্ন বাজেট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেবে এবারের বাজেট এমনটাই আশাকরি। বাজারে গেলে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় সাধারণ মানুষকে। যে চালের দাম কয়দিন আগেও ১৫০০ টাকা দিয়ে কিনেছি তা এখন  প্রায় ২৫০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সবজির বাজারেও একই অবস্থা। যে হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে সে হারে বেতন তো বাড়ছে না। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতেই বেতনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাচ্চাদের স্কুল, যাতায়াতসহ জীবন প্রণালীর প্রতিটি ধাপই ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের লোকজনের পক্ষে জীবনধারণ করা কষ্টকর। তাই স্বপ্ন বিলাসী নয় বাস্তব একটি বাজেট চাই। বারিধারা নিবাসী গৃহিণী সুরাইয়া হাসনাঈন দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এবারের বাজেট বিশেষ দৃষ্টি দেবে বলে আশা করেন। তিনি বলেন, ‘বাজার পরিস্থিতি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এবারের বাজেট এই আতঙ্ক থেকে আমাদের মুক্তি দিবে, প্রধান চাওয়া এটি। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে বাজেটের বিশেষ নজর দেয়া উচিত বলে মনে করি।’গৃহিণী মিনারা বেগমের বাসা আদাবরে। বাজেট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় গ্যাস নেই। সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে রান্না-বান্না করছি। এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনতেই ১৪০০ টাকা চলে যায়। মাসে ৩-৪টি সিলিন্ডার লাগে কমপক্ষে। গ্যাস সংযোগ যেহেতু দেয়া সম্ভব হচ্ছে না সেহেতু এলপি গ্যাসের ওপর আমাদের নির্ভর করতেই হবে। কিন্তু দামটা হাতের নাগালের মধ্যে হওয়া জরুরি। এবারের বাজেটে এলপি গ্যাসের দাম কমানো হবে বলে আশা করছি। এছাড়া বিদ্যুতের দামও যেভাবে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে তাতে করে জীবন নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। চিকিত্সা সেবা, যাতায়াত, ভোগ্যপণ্যসহ প্রতিটি খাতই এখন ব্যয়বহুল। কাজেই মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর কথা ভেবে নয়, আমাদের মত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট করা হবে বলে আশা করি।’

 

সংশ্লিষ্টজনদের ভাবনা

বর্তমানে ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নারীর উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্ব্বিত করা। এ ক্ষেত্রে সরকার অনেকটাই সফল। জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী ২০০৬ সালে ১১৫টি দেশে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯১তম। এখন ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮তম। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অবস্থান বর্তমানে দশম। পৃথিবীতে এটা বিরল। এটা দেশের জন্য একটি সন্তুষ্টির বিষয়। নীতি, কৌশল, পদ্ধতি সবকিছুর যৌথ ও সমন্বিত প্রয়াসের ফসল হিসেবে বর্তমানে নারীরা ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু এসব নারীদের উন্নয়ন যাত্রা অব্যাহত রাখতে চাইলে বা সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে অবশ্যই নারীদের জন্য যুগোপযোগী একটি বাজেট প্রয়োজন। এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টজনরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বাজার অর্থনীতি নারীকে অনেক শক্তি দিয়েছে এবং ক্ষমতায়িত করেছে। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেই উন্নয়ন হবে কি-না তা যাচাই করতে হবে। বাজেটের যথার্থ মনিটরিং হয় কি-না তা দেখতে হবে। সরকারকে নীতি ঠিক করতে হবে, জনগণই তার ভাগ্য পরিবর্তন করবে। নারীর ক্ষমতায়ন রাজনৈতিকভাবে হতে হবে। একটি দেশের   অর্থনীতি যখন ঊর্ধ্বগতিসম্পন্ন হয় তখন নারীর অবদান   থাকে, কিন্তু এই উন্নয়নের পর্যায়ে নারী সমাজের কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু নারীদের অংশগ্রহণই নয়, তাদের গুণগত অংশগ্রহণ জরুরি। যেমন নারীরা গার্মেন্টে কাজ করে, কিন্তু নারীর হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই। কাজেই নারীর অংশগ্রহণকে এভাবে সব ক্ষেত্রে বাড়াতে হবে ও দৃশ্যমান  করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ নারীর ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার এবং এই নীতি বাস্তবায়নের শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে জাতীয় বাজেট। অথচ গত তিনটি অর্থবছরের বাজেটে এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে নারীর স্বাস্থ্য আজ কেবল প্রজনন স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এক কথায় নারীদের উন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী একটি বাজেট অবশ্যই লাগবে। এর বিকল্প কিছুই নেই।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, জেন্ডার সমতা নারীর ক্ষমতায়ন- এ বিষয়গুলো যতদিন পর্যন্ত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় যুক্ত করা হয়নি ততদিন সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জেন্ডার সংবেদনশীল একটি  বাজেটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সামগ্রিক নীতিমালার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে হবে এবং সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।