পাচারের শিকার বাংলাদেশিদের দুর্ভোগের শেষ নেই। ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশি নাগরিক কিনা তা শনাক্তেই লেগে যাচ্ছে মাসের পর মাস। নাগরিকত্ব শনাক্তের এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে থাইল্যান্ডসহ বিভিন্নদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকতে হয় তাদের। করছেন মানবেতর জীবন যাপন। সম্প্রতি এ নিয়ে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে থাই পুলিশ। এই পরিস্থিতিতে দূতাবাস থেকে বাংলাদেশিদের নাগরিকত্ব শনাক্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্নের তাগিদ দিলেও আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে মিয়ানমার রাষ্ট্র কর্তৃক নির্যাতিত রোহিঙ্গারা কৌশলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করছে। শুধু থাইল্যান্ডেই হাজার হাজার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে বাংলাদেশি পরিচয়ে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপকর্ম করে বদনাম ছড়াচ্ছে।
মানবপাচারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, না জেনে শুনে মানুষের এভাবে বিদেশপাড়ি দেয়া কাম্য নয়। যারা নিরীহ মানুষকে অবৈধভাবে বিদেশ নিয়ে যাবে সেই সকল দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যারা সরকারিভাবে বিদেশ যাচ্ছে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে হয়রানির কোন শিকারও হন না। তবে তিনি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের নাগরিকত্ব শনাক্ত আরো সহজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, থাইল্যান্ডের বিভিন্ন থানা হাজত, কারাগার ও ডিটেনশন সেন্টারে আটক অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে অসংখ্য বাংলাদেশি রয়েছে। থাই প্রশাসন থেকে নামের তালিকাসহ সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশি নাগরিক কিনা তা শনাক্তের জন্য দূতাবাসকে প্রতিনিয়ত অবগত করে আসছে। বাংলাদেশিদের শনাক্ত করতে দূতাবাসের লেগে যাচ্ছে কমপক্ষে চারমাস সময়। সাধারণত থাই প্রশাসনের দেয়া নামের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাস পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে থাকে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ওই তালিকা পাঠানো হয় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে লেগে যায় প্রায় চার মাস। ফলে নাগরিকত্ব শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভাগ্যে জোটে হাজতবাস। নাগরিকত্ব শনাক্ত কার্যক্রম সহজ করার জন্য থাই প্রশাসনও বাংলাদেশি দূতাবাসকে সুপারিশ করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসের কনস্যুলার মোহাম্মদ এহতেশাহমুল হক ইত্তেফাককে বলেন, নাগরিকত্ব শনাক্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আমাদের প্রায় চার মাস লেগে যাচ্ছে। মানবিক কারণে দ্রুত নাগরিকত্ব শনাক্ত সম্পন্নের জন্য বলা হলেও কার্যকর কোন উন্নতি হয়নি।
রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট
থাইল্যান্ডে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বহন করছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা হিসাবে পরিচিত (নিজেও রোহিঙ্গা পরিচয় দেন) এমন অসংখ্য রোহিঙ্গা টাকার বিনিময়ে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। ২৫ হাজার বাথের (থাই টাকা) বিনিময়ে দূতাবাসের কিছু অসত্ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পাসপোর্ট নিয়েছে রোহিঙ্গারা। থাইল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার স্বীকৃতি না দেয়ায় তারা কৌশলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বৈধভাবে থাইল্যান্ডে বসবাস করছে। প্রায় ৫ থেকে ১০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছেন। তবে এসব পাসপোর্ট বিগত কয়েক বছরের রোহিঙ্গাদের সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশি দূতাবাসের টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে থাই প্রশাসনও বিব্রত। এই ইস্যুতে বাংলাদেশি দূতাবাসের কার্যকারিতাকে গুরুত্ব দেয় না থাই প্রশাসন।
মিয়ানমারের আরাকান থেকে অবৈধভাবে থাইল্যান্ডে আসেন আলম নামের এক রোহিঙ্গা। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি হাতজ্জাই অবস্থান করে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার করে আসছেন। তিনি যে রোহিঙ্গা তা নিজেও স্বীকার করেছেন। তবু আলম টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছেন। বাংলাদেশি পরিচয়ে মানবপাচার কার্যক্রম করে যাচ্ছিলেন। যদিও বর্তমান মানবপাচার কার্যক্রম থেকে আলম নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। আলমের মতো অসংখ্য রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের বদনাম বাংলাদেশের ঘাড়ে
থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পরিচয়ে শ্রম বাজার দখল করে নিচ্ছে। আর এতে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা পড়েছে সমস্যায়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বিভিন্ন পন্থায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, খুনসহ নানা অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। আর তাদের সকল অপরাধের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের। এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। বিভিন্ন দূতাবাসের পাশাপাশি ঢাকা এবং চট্টগ্রামের একটি চক্র এবং দালাল শ্রেণির লোকেরা বিশাল অংকের টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বানিয়ে দিয়ে থাকেন। পাসপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক স্বীকৃত হওয়ার পর তাদের সকল কাজের দায়ভার বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে। এসব নাগরিকের দ্বারা সংঘটিত সকল আইনবিরোধী কাজের দায়-দায়িত্ব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এ বিষয়ে ঢাকার পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, একসময় ১ লাখ পাসপোর্ট খোয়া গিয়েছিল। সেগুলো রোহিঙ্গাদের হাতে চলে যেতে পারে।
থাইল্যান্ডে বৈঠকে বসছে ১৭ দেশ
মানব পাচার রোধে কী পদক্ষেপ নেয়া যায় সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি দেশ আজ বৃহস্পতিবার ব্যাংককে বৈঠকে বসছে। এতে মানব পাচারকে মূল ইস্যু হিসেবে আলোচনায় উপস্থাপন করবে থাইল্যান্ড। বৈঠকে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড ও জাপানও এ বৈঠকে পর্যবেক্ষক পাঠাবে। এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম, জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের (ইউএনওডিসি) প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক গতকাল রাতেই থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দলও ওই বৈঠকে অংশ নিবে।