পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ইকড়ি ইউনিয়নের তালতলা নামক স্থানে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া খাদে পড়িয়া আহত হইয়াছেন ৩০ জন যাত্রী। শনিবার সকালে পিরোজপুর-মঠবাড়িয়া আঞ্চলিক সড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, দুর্ঘটনাই যেন আমাদের নিয়তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে প্রায় প্রতিদিনই ঘটিতেছে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা। আর এইসকল দুর্ঘটনায় হতাহত হইতেছেন বহু মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় নিশ্চিহ্ন বা সর্বস্বান্ত হইয়া যাওয়া পরিবারগুলির হূদয়বিদারক আর্তনাদ এখন হয়ত আমাদের আর স্পর্শও করে না। কারণ দুর্ঘটনার আধিক্যের কারণে রক্তমাংসের মানুষগুলি ইতোমধ্যে পরিণত হইয়াছেন সংখ্যায়। দ্রুত বর্ধমান সেই সংখ্যা জাতীয় সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান করিয়া লইয়াছে বহু আগেই। সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধেও তাহা উল্লিখিত হইতেছে নিয়মিতভাবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদনেও সড়ক দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত তুলিয়া ধরিয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হইতেছে। দেওয়া হইতেছে নানা পরামর্শ। কিন্তু কিছুতেই কাজ হইতেছে না। থামানো যাইতেছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সমীক্ষা অনুসারে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ২০টি করিয়া দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, এইসকল দুর্ঘটনার ২৬ শতাংশই ঘটাইতেছে ট্রাক। আর ইহার মূলে রহিয়াছে অদক্ষ চালক। বিআরটিএ, বিভিন্ন মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রের বরাত দিয়া সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ৬০ শতাংশ ভারী ট্রাক চালানো হইতেছে মধ্যম ও হালকা শ্রেণির লাইসেন্স দিয়া। অন্যদিকে, ভারী যানবাহন চালানোর জন্য উপযুক্ত চালকের সংকটও তীব্র। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব জানাইয়াছেন, দেশে বাস-ট্রাক ও ট্যাংকলরির সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। তন্মধ্যে আড়াই লাখ চালকেরই ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নাই। নাই যথাযথ প্রশিক্ষণও। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। তবে ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনার ইহাই যে একমাত্র কারণ নহে—তাহাও সুবিদিত। দীর্ঘদিন যাবত্ দেশের সমগ্র সড়ক-মহাসড়ক জুড়িয়া যে মহাবিশৃঙ্খলা বিরাজমান তাহাতে চালক যত দক্ষই হউক না কেন, দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন। বাস্তবতা হইল, চালক-পথচারী কেহই কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। পথচারীরা যেমন যাহার যেইখানে ইচ্ছা যেইভাবে ইচ্ছা সড়ক পারাপার করিতেছেন, তেমনি বাস-ট্রাকগুলিও স্বেচ্ছাচারিতা চালাইয়া যাইতেছে দাপটের সঙ্গে। আবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়শ যে নিয়মকানুনের কথা বলিয়া থাকেন, কী সেই নিয়মকানুন তাহাও স্পষ্ট নহে। দেশের বেশিরভাগ সড়ক-মহাসড়কেই কোনো প্রকার রোডসাইন নাই বলিলেই চলে। এমনকী প্রায় দুইকোটি জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ রাজধানী ঢাকায় বহু অর্থ ব্যয় করিয়া অত্যাধুনিক সংকেত বাতি স্থাপন করা হইলেও বাস্তবে তাহার কোনো কার্যকারিতা নাই।
সর্বোপরি, অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কই বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্মিত হয় নাই। উপজেলা কিংবা জেলাবোর্ডের সড়কগুলিকেই খানিকটা প্রশস্ত করিয়া আঞ্চলিক বা জাতীয় মহাসড়ক নামে চালানো হইতেছে। কিন্তু কারিগরি দিক হইতে বিদ্যমান মারাত্মক ত্রুটিগুলি সারানো হয় নাই। ফলে একদিকে যেমন সংলগ্ন গ্রামগঞ্জের যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক যানবাহনগুলি সরাসরি আঞ্চলিক বা জাতীয় মহাসড়কে উঠিয়া আসিতেছে, অন্যদিকে তেমনি দ্রুতগতির এইসকল মহাসড়কের পাশেই গড়িয়া উঠিয়াছে বাজার ও দোকানপাট—যাহা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ ইহাই হইল স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির একটি সাধারণ চিত্র। অনস্বীকার্য যে, রাতারাতি এই অবস্থা বদলাইবে না, কিন্তু বদলাইবার মতো দৃঢ় সংকল্প ও কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান কিনা তাহাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মনে রাখা আবশ্যক যে, এত ছোট একটি দেশে ১৭ কোটি মানুষকে ধারণ করিতে হইলে শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নাই।