সাধারণত কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে রূপান্তরকেই শিল্পায়ন হিসেবে গণ্য করা হয়। শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির অপরাপর খাত-উপখাতের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই পরিবর্তন যত দ্রুত হবে দেশের অগ্রগতিও তত ত্বরান্বিত হবে। তাই দেশের অগ্রগতির জন্য এই রূপান্তর অপরিহার্য। কিন্তু শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তার। নতুন কোনো পণ্য বা সেবার সৃষ্টি বা ধারণার উদ্ভাবনই হলো উদ্যোগ বা শিল্পোদ্যোগ। আর যিনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাকেই আমরা উদ্যোক্তা বলি।
মানুষের নানামুখী ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে প্রয়োজন সম্পদ সৃষ্টি। এই সম্পদ আপনা-আপনিই সৃষ্টি হয় না। সম্পদ শ্রম দিয়ে, বিদ্যা দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, প্রযুক্তির সাহায্যে সৃষ্টি করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা (Research), আবিষ্কার (Invention) এবং উদ্ভাবন ও উন্নয়ন (Innovation & Development)। গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে জ্ঞান ও নতুন পদ্ধতি সৃষ্টি হয়। এই জ্ঞান ও পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্রমান্বয়ে উদ্ভাবনের মাধ্যমে উত্পাদন কার্যে প্রয়োগ করা হয়। এ সবকিছুই অর্থনৈতিক কার্যকলাপের অন্তর্ভুক্ত। সম্পদ সৃষ্টির এই পরস্পর-সম্পর্কিত গবেষণা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও উন্নয়ন এই সমগ্র প্রক্রিয়াটিই যারা সম্পাদন করেন, তাদেরকেই বলা হয় উদ্যোক্তা। নিত্যনতুন পণ্য ও পদ্ধতি আবিষ্কার, বাজারজাতকরণের অনিশ্চয়তা, শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলা এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নে যারা পিছপা হন না তাঁরাই উদ্যোক্তা। এই উদ্যোক্তা (Entrepreneur) নামটি শুম্পেটরের দেয়া।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অনেকাংশে এই উদ্যোক্তার জোগানের উপর নির্ভরশীল। শিল্প বিপ্লবের (১৭৬০-১৮৩০) ফলে ব্রিটেনের যে উন্নয়ন ঘটে, তাতে বিশেষ অবদান রেখেছিল এই উদ্যোক্তা গোষ্ঠী। শুধু ব্রিটেনে নয়, বিশ্বের সকল শিল্পোন্নত দেশের উন্নয়নের পশ্চাতে শিল্পোদ্যোক্তা গোষ্ঠী বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে অনুন্নত দেশের পশ্চাত্পদতার অন্যতম কারণ শিল্পোদ্যোক্তা জোগানে ব্যর্থতা। কেননা উন্নয়নের জন্য সম্পদ সৃষ্টির প্রয়োজন। আর এ কাজটি করেন উদ্যোক্তারা। অবশ্য সম্পদ সৃষ্টি হলেই সমাজের সকলে তা থেকে উপকৃত হবে তার নিশ্চয়তা নেই। এই নিশ্চয়তার জন্য প্রয়োজন ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি। তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন কর্মসংস্থান। উত্পাদনমুখী কর্মসংস্থান হলেই সম্পদের সৃষ্টি হবে। কাজেই যে দেশে উদ্যোক্তার জোগান যত বেশি সে দেশের অগ্রগতিও তত দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। উন্নত দেশগুলোর আজকের স্তরে উপনীত হওয়ার অন্যতম কারণ উদ্যোক্তার প্রাচুর্য। বিপরীতে আজকের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অনগ্রসরতার কারণ উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি বা অপ্রাচুর্য।
কোনো দেশ নানাবিধ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলে আপনা-আপনিই তা উন্নত দেশে পরিণত হবে না। হলে নাইজেরিয়া, আইভরিকোষ্ট, সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের মতো দেশসমূহ আজ দরিদ্র থাকতো না। অপরদিকে জাপান, কোরিয়া, এবং ইউরোপীয় অনেক দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র হয়েও আজ পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় উন্নত দেশ। আজকের অন্যতম উন্নত দেশ জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল শিল্প শহর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল জাপান আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তবে জাপান ধ্বংস হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু উদ্যোক্তার তেজস্বিতা অটুট ছিল। উদ্যোক্তা উদ্ভাবনে বিশ্বাসী। উদ্ভাবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন গবেষকরা। গবেষকদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি অথবা পণ্যের প্রায়োগিক সফলতা প্রমাণিত হলেই উদ্যোক্তারা তা লুফে নেবে এবং আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি গবেষণায় বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। এ কারণেই উদ্যোক্তা ও গবেষকদের সম্পর্ক নিবিড়। অন্যভাবে বললে অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতপক্ষে গবেষকরা গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করেন বীজ আর এই বীজ থেকে ফসল ফলাতে হলে প্রয়োজন উদ্যোক্তা ও গবেষকদের সেতুবন্ধন। এই সেতুবন্ধন যত দৃঢ় হবে ততই নিত্যনতুন বীজের উদ্ভাবন ঘটবে এবং উদ্যোক্তারা তা থেকে ফসল ফলাবেন এবং দেশও সমৃদ্ধশালী হবে। তবে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কারখানায় সফল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। উদ্যোক্তাই বলে দেবে কী ধরনের দক্ষ জনশক্তি দরকার। শিল্প-কারখানার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা হয় কারিকুলাম এবং তদনুযায়ী কর্মীবাহিনী। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত কারিগরি এবং বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তারা শ্রমিক অথবা কর্মকর্তা হিসেবে কারখানায় যোগ দেয়। প্রকৃত উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রায়োগিক সফলতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে শ্রমিক-কর্মকর্তা অথবা পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেয়। এবং ফ্যাক্টরিতে থাকাকালীন শুধু পণ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্তরের আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়াদি নয়, শ্রমিকের দক্ষতা হ্রাস-বৃদ্ধি, তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি, কর্মক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ, সাফল্য ও ব্যর্থতার বিষয়াদি স্বচক্ষে দেখাও প্রকৃত উদ্যোক্তার কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত। তাছাড়া বাজারে প্রতিযোগিতার স্তরে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে উদ্যোক্তা সচেতন থাকেন। কেননা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যিনি কম দামে উচ্চমানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করতে পারবেন তিনিই টিকে থাকবেন। এবং দীর্ঘ সময়ে বাজারে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবস্থান ধরে রাখতে পারলে পণ্যটির ‘ব্রান্ডিং’ ইমেজ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাজারে অবস্থান সংহত হয়। উল্লেখ্য যে, পণ্যের উত্পাদন খরচ শুধু সস্তা শ্রমের উপর নির্ভর করে না। শ্রমের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির কারণেও খরচ হ্রাস পায়। উন্নত প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, উপযুক্ত মজুরি এ সবকিছু্ই উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির নিয়ামক।
উল্লেখ্য যে, কারখানার উত্পাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ; তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একজন দক্ষ শ্রমিকের ভূমিকা। প্রযুক্তি প্রয়োজনে ক্রয় করা যায়। কিন্তু একজন দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে হয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং ব্যয়বহুল। কিন্তু একবার অভিজ্ঞতা অর্জন করলে স্বল্প সময়েই তার উপর বিনিয়োগকৃত অর্থ বহুগুণ মুনাফা আকারে উদ্যোক্তার মূলধন স্ফীত করবে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত উদ্যোক্তা ডেল কার্নেগি বলেছিলেন: “আমার কারখানার সকল সম্পদ নিয়ে যাও, শুধু দক্ষ শ্রমিক রেখে যাও। শ্রমিক থাকলেই হারানো সম্পদ ফিরে পাবো।” অর্থাত্ দক্ষ শ্রমিকই কারখানার প্রাণ।
স্বাধীনতার ৪৭ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির (কৃষি, শিল্প, সেবা) সকল খাতেই দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কৃষি প্রান্তিক দশা অতিক্রম করে ১৯৭২-৭৩ সালের খাদ্য উত্পাদন ১ কোটি ১০ লাখ টনের স্থলে বর্তমানে ৩ কোটি ৬০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুত্সহ ভৌত অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পোশাক শিল্পে একঝাঁক উদ্যোক্তার আগমন কাঁচামালনির্ভর রপ্তানিকে শিল্পপণ্যনির্ভর রপ্তানিতে পরিণত করেছে। এবং পোশাক শিল্প ৪০ লাখ শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছে যার প্রায় ৭০ শতাংশই নারী শ্রমিক। তাসত্ত্বেও জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের অবদান এখনও ২০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি। এর কারণ, শিল্পোদ্যোক্তা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি পায়নি এবং গত দুই দশকে যেহারে পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তারা শিল্প তৈরিতে এগিয়ে এসেছিল তা ইদানীং হ্রাস পেতে শুরু করেছে। অথচ এতদিন অবকাঠামোকে বিনিয়োগের একনম্বর সমস্যা বলা হলেও আজ এক দশক আগের তুলনায় তা অনেক উন্নত। তা সত্ত্বেও নতুন কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। তাছাড়া পোশাক শিল্প শৈশবকাল পেরিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে একনম্বর স্থান করে নিলেও এ উপখাতে তেমন কোনো মৌলিক শিল্প গড়ে ওঠেনি। এখনও তা অনেকটা বাণিজ্য সহযোগী শিল্প হিসেবেই পরিচিত। তবে অনেক দেশই বাণিজ্য সহযোগী শিল্প দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তীকালে মূল শিল্পে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই শিল্পে তিন দশক অতিবাহিত হলেও এখনও সেই স্তরে উপনীত হতে পারেনি।
আরও উল্লেখ্য যে, নতুন কোনো পণ্য বাজারজাতকরণে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। তবে তা অনির্দিষ্ট সময়কালব্যাপী প্রণোদনানির্ভর চলতে থাকলে উদ্যোক্তা উদ্ভাবন, দক্ষতা এবং গুণগত মান বৃদ্ধিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং একসময় প্রণোদনা বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমাদের রপ্তানি খাতে পণ্য বহুমুখিতা (Diversification) এবং পশ্চাত্য-সংযোগ সম্প্রসারণ (Backward-linkage Expansion) এবং সম্মুখ-সংযোগ সম্প্রসারণে (Forward-linkage Expansion) গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি প্রণোদনা এবং শুল্কমুক্ত বাজার নির্ভরশীলতা নিয়ে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যাবে না।
শুরুতেই যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও পশ্চাত্পদতার অন্যতম কারণ শিল্পোদ্যোক্তার অনুপস্থিতি। গত সাড়ে চার দশকে অবকাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু একমাত্র পোশাক খাত ছাড়া নতুন শিল্পখাতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেনি। অথচ এই সময় দেশে একটি বিশাল কোটিপতি গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। কেননা বাংলাদেশের এই নব্য ধনিক শ্রেণির উল্লেখযোগ্য অংশের আবির্ভাব উত্পাদনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে হয়নি, হয়েছে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং বিভিন্নভাবে অবৈধপথে সম্পদ আহরণের মাধ্যমে। বিনাশ্রমে, অনায়াসে এবং অবৈধপথে অর্জিত সম্পদ উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় না। তাই দুর্নীতি আর লুণ্ঠনের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় মানুষের ধনী হওয়ার কারণেই বাড়ছে বৈষম্য। আর এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যই আজ উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়। বিনিয়োগের জন্য অর্থ কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা উদ্যোগী মানুষের।
দেশের সিংহভাগ মানুষকে প্রান্তিক স্তরে রেখে মুষ্টিমেয় ধনীর হাতে অর্থ জমা হলে দেশে বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। আর যে দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও যদি আয় বৈষম্য বাড়তে থাকে বুঝতে হবে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। সবশেষে, দেশে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সুশাসন এবং সেইসাথে প্রয়োজন বিনিয়োগের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে।
n লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়