ইউরোপ-আমেরিকায় ২৫ বছরের তরুণরা যখন নিজ প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়, সে বয়সে এ দেশের তরুণরা স্বপ্ন দেখে ঐ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকাল নয়টা থেকে পাঁচটার ক্লাস আর পাঠ্যবইয়ের ফাঁকে চাকরির বই পড়ে সময় শেষ করা তরুণদের উদ্যোক্তা হবার চিন্তা মাথায় আনার সময় কই! বলছিলাম বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণের কথা। যারা শুধু স্বপ্নের পেছনে ছুঁটে চলতেই শিখে, কাউকে স্বপ্ন দেখাতে শিখে না।
এ যে এত কথা। এত সমস্যা। এর দায় কার? শুধুই কি শিক্ষার্থীর? নাকি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার? একটু চিন্তা করতেই হয়। প্রতিনিয়ত বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে। আদৌ কি এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরিই হতো তাহলে কখনো শিক্ষার্থীরা নিজের পড়া বিষয়ে ভবিষ্যত্ না গড়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নিত না। সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে তা বের করার কথা কেউ ভাবছে না। সবাই শুধু বলছে, এ দেশের তরুণরা বিসিএসের পেছনে ছুটে। সমস্যা হলো তরুণ প্রজন্ম কি কাঙ্খিত শিক্ষা পাচ্ছে? সে কি নিজ বিষয়ে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে? তার জন্য নজর দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।
আমরা জানি, একটি দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের হয়ে গড়ে উঠে। আর তার জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ছাত্র-শিক্ষকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই পারে একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্বমানের হয়ে গড়ে তুলতে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষক রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলেছেন নিজেকে। এক শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছিলেন তখন বারবার ফোন আসছিল। তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বললেন, ‘দেখ আমার কাজ পড়াশোনা করানো। রাজনীতি নয়। কিন্তু আজকে যদি আমি রাজনীতি না করি, কাল আমাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। আর এই রাজনীতির জন্য আমি পড়াতেই পারছি না।’ আর তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই শিক্ষকরা জড়িয়ে পড়ছেন রাজনীতিতে।
রাজনীতির কারণে শিক্ষকরা ক্লাসেও তেমন সময় দিতে পারে না। আর তাই অনেকসময় ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ক্লাসের অপেক্ষা করতে যেয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের মূল্যবান সময় শেষ করে ফেলছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা চলে যায় ক্লাসের পেছনে ছুটে। তাহলে তারা কখন চিন্তা করবে উদ্যোক্তা হবার। আর কখন তারা একই বয়সী পশ্চিমাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে নিজে প্রতিষ্ঠান করার চিন্তা করবে। একজন শিক্ষার্থীকে সে জায়গায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই। কারণ তারা প্রকৃত মানুষ গড়ার কারিগর। যারা শত বাধা উপেক্ষা করে ক্লাসে পৌঁছায়। সবার আগে ক্লাসকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তাদের সংখ্যা হাতে গোনা।
বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষকরা মনে করে তাদের রাজনীতিই মূল। আগে সেখানে সময় দিতে হবে। তারা বুঝতে চায় না যে, সময়টা একজন শিক্ষার্থী ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করবে, তখন সে পারতো মূল্যবান সময়টাকে কাজে লাগাতে। কিন্তু বর্তমানে তার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তুমি আগে এখানের পড়ালেখা শেষ করো। তারপর চাকরির জন্য এক বছর পড়াশোনা করবে। তখন দেখবে চাকরি হাতের মুঠোয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কি এমন শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল? নাকি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল জ্ঞান তৈরির কারখানা।
দেশের নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করে বলব, আমরা তরুণ প্রজন্ম। আমরা শুধুই স্বপ্ন দেখতেই পারি এটা ঠিক না। আমরা ভাবতেও পারি। আমরাও হতে চাই কারো স্বপ্নদ্রষ্টা। কিন্তু আমাদের বাদ সাধে কিছু মানুষ। তারা আমাদের ছোট গণ্ডির মাঝে আটকে দিতে চায়। আর তারাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবচেয়ে বড় শত্রু। সবার আগে তাদের রুখে দিন। দেখবেন তরুণ প্রজন্ম উঠে দাঁড়াবে। আর তখনি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আমাদের বাংলাদেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়