শেখার আর শেখানোর ১০ মিনিট

সময়টাই তো তারুণ্যের, সবকিছুই মাত করে রেখেছে তারা। দুর্দান্ত সব আইডিয়া আর দুর্নিবার আগ্রহ নিয়ে প্রযুক্তির রথেও জয়জয়কার তাদের। একুশ শতকের এই সময়টাতে এসেও যখন গত্বাঁধা পড়ালেখা আর পরীক্ষার চাপে নিজের চিন্তাভাবনাকে একটু ভাবনার আকাশে মেলে ধরতে হাজার বাধা, ঠিক তখন একদল বাংলাদেশি ছেলেমেয়ে অসাধারণ এক ই-এডুকেশন মাধ্যম তৈরি করেছে। http://10minuteschool.com/ এই ওয়েবসাইটেই মিলবে এসএসসি থেকে শুরু করে বিসিএস এমনকি আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ। সামাজিকমাধ্যমে পরীক্ষার জনককে খুঁজে কটুক্তি ঢের হয়েছে, এবার চলুন খোঁজ করা যাক পরীক্ষাকে কাবু করতে আসা এই দলটার। জানাচ্ছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় হাঁটছেন আর আশপাশে ‘প্রশ্নব্যাংক’ শিরোনামের ব্যানার-লিফলেট চোখে পড়ছে না, তা হতেই পারে না। নিশ্চয়ই এটা নতুন অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক নয় বা প্রশ্ন তালাবদ্ধ করে রাখার লকারও নয়? প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষার প্রশ্নগুলো একটু যাচাই করে নিতেই শত প্রকাশক হাজারো প্রশ্ন এক করে বই বের করে বসে থাকেন। আর কয়েক কেজি ওজনের সেসব টেস্ট পেপার আর প্রশ্নব্যাংক কাটাকাটি করে চর্চা করতে গিয়ে রীতিমতো ছোটখাটো একটা গবেষণায় নামতে হয়। 
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ছাত্র আয়মান সাদিকের টেস্টপেপার বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইড নিয়ে সেরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল কিনা জানা নেই। তবে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সাথে তার বেশ যোগাযোগ থাকায় এসএসসি থেকে শুরু করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির যে অগোছালো এক কার্যক্রম সেটা আঁচ করেন তিনি। আর তখনি ভাবনা, এগুলোকে এক করে একজন বা কজন মিলে যদি গুছিয়ে ফেলা যায়, আর সবাই মিলে চর্চা করা যায়, তাহলে শ্রম কমল, দশে মিলে পড়াশোনাও হলো। নাম ঠিক হয় ‘টেন মিনিট স্কুল’, দশ মিনিটের পাঠশালা!
 
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জয়ী আয়মান যখন এই কাজে হাত দিলেন, বুঝতে তার বাকি রইল না, এ নিজের পড়ার টেবিল গুছিয়ে রাখার মতো সহজ কিছু না। অনেক অনেক বিষয়, অনেক অনেক পরীক্ষা আর শেখার ধরনও একেক জনের একেক রকম। ঠিক এক মিনিটের বিজ্ঞাপন নির্মাণে যেমন হাজার মিনিটের শুটিং হয়, তেমনি যেন দশ মিনিটে সবকিছু সামনে হাজির করতে কত শ দশ মিনিট লাগবে তার হিসাব কষেই শেষ করা যাচ্ছিল না। আর শুধু প্রশ্নই থাকবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা? হোক না ভার্চুয়ালি, কিন্তু আবারও তো কাউকে ধরে শুধু পরীক্ষা দিতেই বসিয়ে দেওয়া যায় না। কিছু দরকার, যেগুলো হয়তো কোনোদিন কোনো বিসিএস প্রশ্নে আসবে না, কিন্তু বন্ধুদের আড্ডায় চট করে উত্তর দিতে পারলে বেশ উঁচু গলায় কথা বলা যাবে। কিছু আইকিউও থাকতে পারে, সেগুলো হয়তো মেধাকে ঝালিয়ে নেবে।
 
আয়মানের পক্ষে এ কাজ আর নেহায়েত একা করা সম্ভব হচ্ছিল না। উদ্যোগটা দারুণ, কাজেই বন্ধুদের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেলে এই খবর। সদলবলে জুনিয়র, সিনিয়র ব্যাচমেটের যার যা আছে সেটুকু তারা আয়মানের এই প্রয়াসে দিতে রাজি। শামস, সামিদ, আকিব, সাদমান তাদের ভাবনাগুলোকে প্রতিদিন নতুন আঙ্গিকে আর নতুন ডিজাইনে সাজিয়ে তুলছেন। জিহান, রামিম, মেহেদি, মুনযেরীন, আনিন্দ্য, অনন্যা তৌশিক প্রতিদিন নতুন করে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরি করছেন। বুয়েটের রাইদ একাই অনেকটা ওয়েবসাইটের কাজ ধরে রেখেছেন এবং প্রতিদিন নতুন কিছু বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, নর্থ সাউথ, ব্র্যাকসহ দেশের আরও শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে শামিল হয়েছেন। সবাই মিলে আমার শেখার সময়টাকে দশ মিনিটে আনার জন্য!
 
 
 
 
http://10minuteschool.com/ পুরো ওয়েবসাইটটাই সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। এসএসসি, এইচএসসি থেকে শুরু করে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিট, আইবিএ, মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সর্বাঙ্গীণ ব্যবস্থা আছে এখানে। আবার বিসিএস, ব্যাংক, সরকারি চাকরির পরীক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার লক্ষ্যে IELTS, SAT, GRE, GMAT, TOEFL-এর প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব। এ যেন অনেকগুলো কোচিং সেন্টারকে একত্র করে কম্পিউটারের পর্দায় ঢুকিয়ে ফেলার শামিল!
 
 
‘১০ মিনিট স্কুল’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে যেকোনো বিষয়কে ১০ মিনিটের মাঝেই আয়ত্ত করা সম্ভব। আর এ সবকিছুই বিনামূল্যে সংগ্রহযোগ্য। এখানে ১০ মিনিটের ছোট ছোট কুইজ পরীক্ষা দেওয়া যায়, যেটা সাথে সাথেই প্রাপ্ত নম্বর প্রদান করে উক্ত বিষয়ের উপর শিক্ষার্থীর কতটুকু দখল আছে তা জানিয়ে দেয় এবং কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে তাও জানায় এবং উপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করে। পাশাপাশি অন্য ১০ মিনিট স্কুল ব্যবহারকারী বন্ধুদের সাথে তুলনা করে শিক্ষার্থী কতটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে আছে তা জানিয়ে দেয়। প্রস্তুতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে নিশ্চয়ই প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা উচিত! হ্যাঁ, সেটাও আছে। ওয়েবসাইটে সকল বিষয়ের প্রস্তুতির জন্য টিউটোরিয়াল ও ইনফোগ্রাফিকের ব্যবস্থা রয়েছে।
 
অনলাইন এই পাঠশালার কার্যক্রমের আরও বিস্তার ঘটবে সামনেই। আপনিও চাইলে যুক্ত হতে পারেন একজন শিক্ষক হিসেবে! শেখাবেন, শিখবেন যে অন্য বিষয়টা জানে তার কাছ থেকে। ফেসবুক পেইজ facebook.com/10MinuteSchool-এ গিয়ে যোগাযোগ করলেই হবে, কোন বিষয়ে আপনার আগ্রহ, সেটিও জানান তাদের! এতকিছুর পরেও চর্চাটা নিজের কাছেই, আমরা চাই, শেখার আর শেখানোর এই দুনিয়াটা উন্মুক্ত হোক, তাতেই না এর পসার! শুধুই গল্পে বা প্রতিশ্রুতিতে নয়, এ সময়ের আয়মানেরা করে দেখাচ্ছে, এ রকম ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ আমাদেরকেই নিতে হবে।