ঘুরে আসুন মধুটিলা ইকোপার্ক

পরীক্ষা শেষ। এ সুযোগে ছয়জন খুদে পর্যটক নিয়ে গিয়েছিলাম গারো পাহাড়ের পাদদেশ শেরপুর জেলার মধুটিলা ইকোপার্কে। সুবহে সাদেকের পর প্রস্তুতি নিয়ে নিজস্ব বাহনে ছুট দিয়েছিলাম। অবাক হয়েছিলাম, খুদের দল এত ভোরে উঠতে পারবে বুঝতেই পারিনি! তারাই সবার আগে রেডি। গাড়ি চলছে শিশির ভেজা পথ মাড়িয়ে, গাজীপুর জেলার পুবাইলের পথ ধরে দু’পাশের সবজি ক্ষেত পেছনে ফেলে। চোখ জুড়িয়ে যায়, মন জুড়িয়ে যায়, দৌড়ে পালায় যান্ত্রিক জীবনের সকল ক্লান্তি। শিশুরা সিসামুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছে বুক ভরে।
 
সকাল ৯টা। পেট ক্ষুধায় চো চো করছে। সাথে করে ভুনা খিচুরি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোথাও বসে খাওয়ার মতো পরিবেশ মিলছিল না। অগত্যা ত্রিশাল অঞ্চলের এক বাড়িতে গাড়ি নিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়া। দৌড়ে এল এক পাল শিশু, উত্সুক হয়ে আমাদের দেখছে। ডাক দিলাম, ‘ঘরের ভিতর কেউ কি আছেন?’ এক মহিলা দরজার সামনে এসেই আবার ভোঁ-দৌড়ে ঘরে পালাল। এরপর এল এক যুবক।
IMG0
বিনয়ের সাথে জানালাম, আমরা পথিক আপনার এখানে বসে নাশতা করব। যুবকটি অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে আমাদের বৈঠকখানায় বসালেন। নাস্তা করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবকিছু জোগান দিলেন। পরিচয় হলো। নাম বললেন জসিম। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। ভালো লাগল তাদের ভদ্র আচরণে। জসিম ও তার পরিবারের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।
 
তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটছে। বেলা সাড়ে এগারোটায় পৌঁছে গেলাম শেরপুর শহরে। আগেই হোটেল সম্পদে রুম বুকিং করে রেখেছিলেন শহরের চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শ্রী চন্দন কুমার সাহা। আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ জানাই তার পর্যটনবান্ধব মানসিকতার জন্য। রুমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মধুটিলা ইকোপার্কের দিকে ছুটলাম। কানে ভেসে এল ছোট বোন চামেলীর অনুযোগ। তার স্বামীর কাছে বলছে, ‘ভাইয়ার সাথে কোথাও গেলে চড়কির মতো ঘুরতে হয়।’ সত্যিই তাই!
 
কারণ হাতে সময় থাকে কম, তবে আশার বাণী হচ্ছে আমার গাইডে ভ্রমণে যাওয়া বন্ধু মহল, আত্মীয়, পরিবারের সদস্য এমনকি শিশুর দলও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে চড়কির মতো ঘুরে। তাই এখন কারও তেমন সমস্যা হয় না। বরং খুশি হয় যে, ঘুরতে এসে কাজের ক্ষতি হয় না। এবার সাথে ছিল কনিষ্ঠ কন্যা বাসিতাহ্। মাশআল্লাহ দিব্যি সুস্থ ছিল পুরোটা সময়। ইকোপার্কের গেটের সামনে এসে গাড়ি থামল।
IMG1
বাহারি রং মেখে ভং ধরে আছে একজন যুবক, উদ্দেশ্য আগন্তুকদের বিনোদন দেওয়া। বিব্রত হলাম, পেশাদার চাঁদাবাজদের মতো নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাওয়ায়। নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। দুপুরের আহারের সময় হয়ে এসেছে। তাই পর্যবেক্ষণের আগে কেন্টিনে ঢুকলাম। অ-স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবারের মান দেখে চোখ উঠল কপালে। পার্কের ভেতর একটি মাত্র কেন্টিন, তার এই দুরবস্থা! তাই ভাত-মাছের বদলে কোনোরকমে পুরি-সিঙ্গারা খেয়ে রক্ষা। এ রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় বিনোদন পার্কে পর্যটকদের জন্য এ ধরনের নিচুমানের কেন্টিন পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্তরায়। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন এদিকে।
 
প্রথমে টাওয়ারের দিকে যাওয়া হলো, উপর থেকে ভারতের তোড়া পাহাড় দেখা যায়। দুরবিনে দেখলে বিএসএফের ক্যাম্প চোখে পড়ে। টাওয়ার থেকে মধুটিলা ইকোপার্কটিকে মনে হয় কেউ একজন নিখুঁত হাতে সবুজ গালিচা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। পার্কের চারপাশে ছড়িয়ে আছে নিসর্গের ছোঁয়া। মহুয়া নামের ডাকবাংলোর উপরে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়ালে নিঃস্বার্থ ও উদারতার শিক্ষা পাওয়া যায় সবুজের কাছ থেকে। প্রকৃতি এখানে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।
IMG2
আবার সেই ক্ষুধার জ্বালা, গাড়ি নিয়ে ছুটলাম শেরপুরের আরেক নিসর্গ গজনী অবকাশ কেন্দ্রের দিকে। উদ্দেশ্য কমলার মায়ের ভাতের হোটেলে খাওয়া। এর আগে যখন দে-ছুটের দল নিয়ে ঘুরতে এসেছিলাম, তখন পরিচয়; খাবারে স্বাদ অতুলনীয়। পার্কে গিয়েই পেয়ে গেলাম তাকে, হোটেলের অবস্থা দেখে সবাই ফিসফাস করছে। ‘ভাইয়া কোথায় নিয়ে এলে?’ আমি বললাম, ‘চুপ থাক! খাওয়া শেষে মন্তব্য করবি।’ অর্ডার দিয়ে চলে এলাম, ১ ঘণ্টা সময় দিয়েছি তাদের। এই ফাঁকে ঘোরাঘুরি, জল পরীর গুহা দেখা, লেকে প্যাডেল বোটে চড়লাম। খেতে বসে খাবারের ঘ্রাণে ও স্বাদে সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকি খাবার নিয়ে নেকামি করা শাহ্ আলমও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল।
 
মাগরিবের নামাজের পর ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে গজনী অবকাশকেন্দ্র ত্যাগ করলাম। একটি বিষয় লক্ষ করলাম, যখন পার্কে প্রবেশ করেছিলাম তখন মনে হয়েছিল মত্স্য কন্যার ভাষ্কর্যটি অভিবাদন জানাচ্ছে। আবার দিন শেষে যখন ফিরে যাচ্ছি, তখন মনে হলো যেন মুচকি হেসে আবার আসার আহ্বান জানাচ্ছে। হয়তো এটি আমার মনের খেয়াল। যাই হোক, বন্ধুর  দল কিংবা পরিবার নিয়ে নিসর্গের ছোঁয়া পেতে হাতে দুই দিনের সময় নিয়ে শেরপুরের উদ্দেশে বের হয়ে যেতে পারেন। শহরের মিষ্টির দোকানের খাঁটি দুধের মালাই মিস করবেন না! মনে পড়লে এখনো জিভে জল এসে যায়।

IMG3

যোগাযোগ
ঢাকার মহাখালি বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শেরপুরগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। তবে রেন্ট কার অথবা নিজস্ব পরিবহনে ভ্রমণে যাওয়ার সুবিধাই বেশি। থাকার জন্য শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল ও বোর্ডিং রয়েছে। ভাড়া ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।