রোজার সময় আমরা যে খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করি তা বেশ অস্বাস্থ্যকর। সারাদিন রোজা রাখার পর ভাজা-পোড়া খাবার, শরবত এবং মিষ্টিদ্রব্য দিয়ে আমরা ইফতার করি। অন্যদিকে সেহেরিও খাওয়া হয় ভোর ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে। এই খাদ্যাভ্যাসের ফলে আপনার রক্তে লিপিডের মাত্রা এবং ওজন দুইই বেড়ে যায়। এই মাসে অধিকাংশ মানুষের ওজন বেড়ে যায়, যদিও এই পবিত্র মাসটি আপনার শরীরের বাড়তি ওজন এবং দূষিত পদার্থ কমানোর একটি চমৎকার সুযোগ হতে পারে।
আমরা কি করতে পারি?
রোজা রাখার ফলে আমাদের শরীর কি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তা আমাদের বুঝতে হবে। সর্বশেষ বার খাওয়ার ৮ ঘণ্টা পর আমাদের শরীর উপবাস পর্যায়ে পৌঁছায়, এই সময়ের মধ্যে আমাদের অন্ত্র খাবার থেকে সবধরনের পুষ্টি শুষে নেয়। এরপর, অন্ত্র শরীরের অন্যান্য অংশে, যেমন- যকৃত, পেশী ইত্যাদি; সঞ্চিত গ্লুকোজ ব্যবহার করা শুরু করে। যখন গ্লুকোজ শেষ হয়ে যায়, তখন দেহে শক্তি উৎপাদনের জন্য অন্ত্র দেহে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার শুরু করে। দীর্ঘক্ষণের জন্য কয়েক সপ্তাহ রোজা রাখার পরই দেহ শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রোটিন ব্যবহার শুরু করে।
রমজানের সময়, যখন আমরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকি, তখন শরীরের ওজন কমানোর একটা সুযোগ আমরা পাই। শক্তি উৎপাদনে চর্বি ব্যবহার হওয়ায় আমাদের ওজন এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে থাকে। এই সময় আমরা ডায়াবেটিস এবং রক্তচাপও বেশ ভালভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। কয়েকদিন রোজা রাখার পর রক্তে কিছু হরমোনের (এন্ডরপিনস) মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে আমরা এক ধরনের মানসিক শান্তি অনুভব করি।
তবে, রমজানে যে সময়টুকু আমরা রোজা থাকি না সে সময়ের খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে আমাদের সতর্ক হতে হবে। খাদ্যতালিকায় শক্তি উৎপাদনকারি এবং অন্যান্য পুষ্টিউপাদান সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিৎ, যাতে শরীরের পুষ্টির চাহিদা পুরন হয়। রোজার সময় স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে পরিমাণে কম কিন্তু পুষ্টিউপাদান সমৃদ্ধ খাবার একজন মানুষকে স্বাস্থ্যবান এবং কর্মঠ রাখতে সাহায্য করে।
কীখাবেন এবং কীখাওয়া থেকে বিরত থাকবেন?
জটিল শ্বেতসার এবং আঁশযুক্ত খাবার অবশ্যই খেতে হবে:
এই খাবারগুলো ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে। এরকম খাবারগুলো হচ্ছে: ভাত, ময়দা, সীম ইত্যাদি। আঁশ সমৃদ্ধ সবজিগুলো হচ্ছে: আলু, মিষ্টিকুমড়া, সবুজ সীম, ফুলকপি, শসা ইত্যাদি এবং আঁশ সমৃদ্ধ ফলের মধ্যে আছে: কমলা, আপেল, তরমুজ, বাঙ্গি, আনারস ইত্যাদি।
অবশ্যই মশলাদার এবং ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করবেন।
এধরনের খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বা শ্বেতসারযুক্ত খাবার যেমন- চিনি এবং সাদা ময়দা এবং চর্বিযুক্ত খাবার যেমন- কেক, বিস্কুট , মিষ্টি ইত্যাদি। বেশি তেলে ভাজা খাবার এবং ক্যাফেইন যুক্ত খাবার যেমন- চা, কফি, কোকাকোলা ইত্যাদি পরিহার করুন। এই খাবারগুলো মূত্রবর্ধক।
যে খাবারগুলো পরিহার করবেন
ডুবো তেলে ভাজা খাবার যেমন- পাকোড়া, সমুচা, ভাজা ফুলুরি, স্প্রিং রোল, ডালপুড়ি ইত্যাদি।
উচ্চ মাত্রার চিনি/ চর্বি যুক্ত খাবার, যেমন- মিষ্টি, ফালুদা ইত্যাদি।
বেশি তেলে রান্না করা খাবার যেমন- পরটা, তেলযুক্ত তরকারি, তেলচিটচিটে পেস্ট্রি ইত্যাদি।
উচ্চ মাত্রার চিনি/ চর্বি যুক্ত খাবার, যেমন- মিষ্টি, ফালুদা ইত্যাদি।
বেশি তেলে রান্না করা খাবার যেমন- পরটা, তেলযুক্ত তরকারি, তেলচিটচিটে পেস্ট্রি ইত্যাদি।
বিকল্প স্বাস্থ্যকর খাবার
ছোলা, দই সহ আলু্, সেদ্ধ ফুলুরি ইত্যাদি। ভাজার পরিবর্তে খাবার রান্না বেক (bake) করুন।
দই এবং দুধের তৈরি খাবার যেমন- দই-বড়া।
পরটার বিকল্প হতে পারে তেল ছাড়া তৈরি চাপাটি, পোড়ানো বা গ্রিল গরু বা মুরগির মাংস। বাসায় পেস্ট্রি বাবানোর চেষ্টা করুন এবং একটি মাত্র লেয়ার তৈর করুন।
যে রান্না পদ্ধতি পরিহার করবেন
ডুবো তেলে ভাজা
অতিরিক্ত তেলে রান্না করা তরকারি
অতিরিক্ত তেলে রান্না করা তরকারি
বিকল্প রান্না পদ্ধতি
কম তেলে ভাজা, সাধারণত এতে স্বাদের খুব একটা পরিবর্তন হয় না।
গ্রিল বা পোড়ানো খাবার অধিক স্বাস্থ্যকর এবং এতে খাবারের আসল স্বাদ বজায় থাকে, বিশেষত মুরগি এবং মাছের ক্ষেত্রে।
| তরকারিতে ব্যবহৃত তেল মাপা শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে তেলের পরিমাণ কমান, যেমন- ৫ টেবিল চামচ থেকে কমিয়ে ৪ টেবিল চামচ করুন। স্বাদের বেশি হেরফের না করে তরকারিতে তেলের পরিমাণ কমানোর এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি। তরকারিতে বেশি করে পেঁয়াজ এবং টমেটো ব্যবহার করলেও তেল কমানোর বিষয়টি ধরা পড়ে না। | |
সেহেরি, যা ভোরের আগে খাওয়া হয়, একটি পরিপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার হওয়া উচিৎ, কারণ এটি বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। ফলে সেহেরিতে ধীরে ধীরে হজম হয় এরকম খাবার রাখা উচিৎ। ইফতারের মাধ্যমে আমরা রোজা শেষ করি। ইফতারে সুন্নত মেনে খেজুর থাকতে পারে। খেজুর অতি প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে। ফলের রসও একইভাবে পুনরুজ্জীবিত করে। ভোজনকে ভোজনেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, এটিকে ভোজনোৎসবে পরিণত করা উচিৎ নয়!
উৎস: Maya.com.bd
http://www.maya.com.bd/articles/society/society-traditions/111/568
IMG0