অবৈধ নদী দখলদারদের নাম প্রকাশে সাড়া নেই জেলা প্রশাসনের। গত ২৮ ফেরুয়ারি ৬৪ জেলায় একযোগে দূষণ ও অবৈধ নদী দখলদারদের তালিকা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও গত রবিবার পর্যন্ত একটি জেলা ও একটি উপজেলায় তালিকা প্রকাশ না করেই নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান বলেছেন, তাদের তাগিদ অব্যাহত রয়েছে। সব জেলা থেকে তালিকা প্রকাশ হবে। হয়তো একটু সময় লাগছে। এদিকে এই কমিশনের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় নির্ধারণে জটিলতা এখনো কাটেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার জন্য সারসংক্ষেপ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে নদ-নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়ার পর প্রশাসন থেকে সারাদেশেই বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে প্রভাবশালী মহলের দখলে থাকা স্থাপনা উচ্ছেদে বাধা পাচ্ছে প্রশাসন। মামলা করে উচ্ছেদ ঠেকিয়ে রাখছে অনেকে। এসব মামলা মোকাবেলায় এই প্রথমবারের মতো কমিশন নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করেছে।
প্রসঙ্গত, নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদী দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ, নানাবিধ অনিয়ম রোধ করার জন্য এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নৌ-পরিবহন যোগ্য হিসাবে গড়ে তোলাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ১৯১৩ সালের ২২ জুলাই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। উল্লিখিত কাজে সরকারকে সুপারিশ প্রদানের ক্ষমতা দিয়ে গঠিত কমিশন কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন কাজ করবে বা তাদের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কোনটা সে বিষয়টি আইনে স্পষ্ট করা হয়নি।
মাঠ প্রশাসন যেহেতু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীন তাই কমিশন তাদের অধীনে কাজ করার আগ্রহ জানিয়ে ২০১৮ সালের ৯ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠায়। চিঠির ওপর মতামত প্রদানের জন্য তা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে এ মন্ত্রণালয় কমিশনকে তাদের অধীনে রাখার যৌক্তিতা তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠায়। এখন পর্যন্ত বিষয়টি সেভাবেই ঝুলে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দখলের তালিকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী অনেকের নাম থাকায় জেলা প্রশাসন সে তালিকা প্রকাশে খানিকটা অনাগ্রহী। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান জানান, রবিবার পর্যন্ত পটুয়াখালি জেলা থেকে ১ হাজার ৩০৬ জনের এবং ঢাকার সাভার উপজেলা থেকে ৬৯ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে। তবে ওই তালিকা স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত করা হয়নি। চেয়ারম্যান জানান, এটি ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। আবার উন্মুক্ত স্থানেও টাঙানো হবে। তিনি আরো জানান, সিংহাইয়ের শহীদ আব্দুর রউফ সেতু সংলগ্ন নদীর মাঝখান দখল করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার প্লান্ট তৈরি করছে।
চেয়ারম্যান বলেন, নদীর জমি নির্ধারণ করা বড় সমস্যা। দখলদাররা সীমানা পর্যন্ত মুছে দিয়েছে। তাছাড়া মাঠ প্রশাসনে উচ্ছেদ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নেই। চর পর্যন্ত দখল করে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। মামলা করে তারা অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখছে। তবে কমিশন তত্পর রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪০৫ নদ-নদীর মধ্যে ৩৭টি সবচেয়ে বেশি দখল-দূষণের শিকার। যেসব নদ-নদী ইতোমধ্যে মৃত বা বিলুপ্ত, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে। দূষণযুক্ত নদ-নদীর মধ্যে রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের বড়াল নদী; কুমিল্লা অঞ্চলের ডাকাতিয়া; চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী, হালদা; নেত্রকোনার মগড়া; খুলনার ময়ূর; হবিগঞ্জের খোয়াই ও সোনাই; সিলেট অঞ্চলের সুরমা, পিয়াইন, বিবিয়ানা, বাসিয়া; চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ অঞ্চলের নবগঙ্গা; টাঙ্গাইলের লৌহজং, লাঙ্গুলিয়া; ঢাকা অঞ্চলের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বংশী; কক্সবাজারের বাকখালী; ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র; রংপুরের ঘাঘট, ইছামতী; দিনাজপুরের পুনর্ভবা; বগুড়ার করতোয়া; নওগাঁ-জয়পুরহাটের ছোট যমুনা; নাটোরের নারোদ; কুড়িগ্রামের সোনাভরি; বরিশাল অঞ্চলের সন্ধ্যা; ফরিদপুরের কুমার; সাতক্ষীরার আদি যমুনা; যশোরের কপোতাক্ষ ও ভৈরব; নরসিংদী অঞ্চলের হাড়িধোয়া; গাজীপুরের চিলাই।
গবেষকদের মতে, নগর সংলগ্ন নদ-নদীর দূষণ ও দখল নিয়ে বেশি আলোচনা হয়; কিন্তু দখল-দূষণের থাবা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে। দখল উচ্ছেদ বা দূষণবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হয় মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীকে কেন্দ্র করে।