সাতক্ষীরায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দ শুধু খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সব লুটে খাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির নেতাকর্মী। মসজিদ-মন্দির-স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাস্তা সংস্কারের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে লুট করা হচ্ছে বেশিরভাগ প্রকল্পের টাকা। এমনকি একটি বালিকা বিদ্যালয়ের নামে কয়েক দফা বরাদ্দ দেখিয়ে বারবার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকল্পের টাকায় পাকা করা হয়েছে ব্যক্তিগত বাড়ির উঠান। সুষ্ঠুভাবে কোন প্রকল্পেরই কাজ সম্পন্ন হয়নি। নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে উঠতি নেতাদের নামে দেয়া হচ্ছে সব বরাদ্দ। মূলত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা ক্ষমতাবলে এসব করছেন। সম্প্রতি সাতক্ষীরার উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়া বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে।
কলারোয়ায় গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ স্বপন ও ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু সব বরাদ্দে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। এই দুই নেতা নিয়ন্ত্রণ করছেন সব প্রকল্প। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুধু স্বাক্ষর করে কাজ শেষ করছেন। বেশিরভাগ প্রকল্পে কাজ না করে টাকা উত্তোলন করেছেন প্রকল্প সভাপতিরা। কলারোয়া পৌর সদরসহ ১২টি ইউনিয়নে টেস্ট রিলিফের (টিআর) আওতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে ১২৯টি সৌর বিদ্যুত্ বসানো হয়। কলারোয়া পল্লী বিমোচন ফাউন্ডেশন এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। বাস্তবায়নকারি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বলেন, ৪৮ হাজার টাকার দেড় টন চালের বিপরীতে যে সৌর বিদ্যুত্ প্রদান করা হয়েছে তার দাম ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। বাকি টাকা ভাগ হয়েছে।
কর্মসৃজন কর্মসূচির শ্রমিকদের কাজের প্রাপ্য টাকা থেকে গত বছরের মতো এ বছরও উপজেলা কর্তাদের মোটা অংকের টাকা উেকাচ দিতে হয়েছে। সম্প্রতি তারা সমাজসেবা অফিস থেকে হত দরিদ্রদের ছাগল প্রদান কর্মসূচির অর্ধেক টাকা কেটে রেখে পকেটস্থ করেছেন। প্রতিটি ইউনিয়নে চাঁদাবাজির জন্য বিশেষ ব্রিগেড গড়ে উঠেছে। প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের প্রতিকার চেয়ে কুশোডাংগা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আলী আহমদ জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদনও করেছেন। ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এলজিএসপি, টিআর, কাবিখা ও কাবিটার ১ম পর্যায়ের দ্বিতীয় কিস্তির ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৯৮ টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাত্ করেছেন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
ইউপি সদস্য আলী আহমদ জানান, তার ইউনিয়নে সরকারি কোন কাজ হয়নি। সব টাকা গুটিকয়েক ব্যক্তি লুটপাট করছেন। ইউনিয়নের শাকদাহ বালিকা বিদ্যালয়ে কয়েক দফা বরাদ্দ দিয়ে সব টাকা লুট করা হয়েছে। শুধু ওই ইউনিয়ন নয়, উপজেলার বাকি ইউনিয়নগুলোয়ও প্রকল্পের কোন কাজ হয়নি। খাতা-কলমে প্রতিটি প্রকল্পের শতভাগ অগ্রগতি দেখাতে বাধ্য করা হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে। গত অর্থবছরে সংসদ সদস্যর বিশেষ কোটায় ৯নং হেলাতলা ইউনিয়নের হেলাতলা আইডিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে ৫ টন টিআরের চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু ওই স্কুলে ১০ হাজার টাকায় একটি সোলার স্থাপন করে বাকি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। কত টন চাল এখানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তাও জানেন না ওই স্কুলের শিক্ষকরা।
২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে (টিআর) নগদ ২৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭৫ টাকা, ১৩৪ মেট্রিক টন চাল, সংসদ সদস্যের টিআরের বিশেষ বরাদ্দের ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক টিআরের প্রায় ৬৪ মেট্রিক টন গম এবং আরো ৬৫ মেট্রিক টন গমের প্রকল্পে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবে কোন কাজ হয়নি।
উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ স্বপন ইত্তেফাককে বলেন, ইউপি সদস্য আলী আহমেদ জামায়াতের চেয়ারম্যানের পক্ষ নিয়েছিলেন। তার কাজই বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে বিরক্ত করা। কলারোয়ার ইউএনও খুবই সতর্ক মানুষ। দেখে শুনে তিনি কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন। এখানে নয়-ছয় হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরাদ্দের টাকায় ঠিকভাবেই কাজ হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
সরেজমিনে তালা উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের ৫নং শিরাশুনী গ্রামের জামতলা হতে মলঙ্গী পাড়া পর্যন্ত কাবিটার রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় ৩ লাখ টাকা প্রাক্কলন ব্যয়ে উক্ত রাস্তায় যত্সামান্য মাটি ফেলে বরাদ্দকৃত টাকা স্থানীয় নেতাদের সহায়তায় আত্মসাত্ করেছে প্রকল্পের সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ রবিউল ইসলাম রাজু। সরেজমিনে গেলে এমন অভিযোগ করেন ঐ এলাকার মোক্তার শেখ, মতিয়ার রহমান, আশরাফুজ্জামান পিন্টু, কোস্তর শেখ, আরমান শেখসহ অনেকেই। খলিলনগর ইউনিয়নের গোনালী ঘোষপাড়া রাধা গোবিন্দ মন্দিরের অনুকূলে পর পর তিন দফা টিআর-এর চাল বরাদ্দ পেলেও সেখানে কোন কাজ হয়নি। ওই প্রকল্পের সভাপতি উপজেলার গোনালী গ্রামের নির্মল ঘোষের পুত্র সুবাস ঘোষ। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের আপন ভাই। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কিছুটা হলেও কাজ হয়েছে। একেবারে হয়নি এটা ঠিক নয়।
উপজেলার খলিলনগর গ্রামের নওয়াব আলী সরদারের ছেলে সামাদ সরদারের বাড়ির রান্নাঘর হতে উঠান পর্যন্ত এডিপি প্রকল্পের ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রাস্তা সংস্কারের জন্য উক্ত টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও উনি নিজের উঠান পাকা করেছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি সামাদ।
তালা উপজেলায় এডিপি প্রকল্পের ১ কোটি টাকার কাজ ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। কাগজে-কলমে টেন্ডার আহবান করা হলেও বাইরের কোন ব্যক্তি সিডিউল ক্রয় করতে পারেনি। বিক্রি করতে দেয়া হয়নি কোন সিডিউল। এ ব্যাপারে তালা এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী কাজী আবু সাইদ মো. জসিম টেলিফোনে জানান, এডিপির এক কোটি টাকার কাজে যে কয়টি সিডিউল বিক্রি হয়েছে সেই কয়টি সিডিউল জমা পড়েছে। বাইরে থেকে কেউ ভাগাভাগি করলে তাদের কিছুই করার নেই।
শ্যামনগর ঘুরে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দুইশ’ বায়াত্তরটি সোলার প্যানেল। যে সব ব্যক্তিদের বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে তাদের নিকট থেকে পাঁচ/ছয় হাজার টাকার উেকাচ নেয়ার অভিযোগ এসেছে। এছাড়াও সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোন নিয়ম। এসব সৌর বিদ্যুত্ গ্রাহকরা জানান, প্রতি দেড় টন টিআরের চালের বিপরীতে একটি করে সৌর বিদ্যুত্ প্যানেল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যার দাম ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা মাত্র। ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্পে শ্যামনগর উপজেলায় সরকারি ভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে দশ কোটি সতের লাখ টাকা। এর নাম মাত্রই কাজ হয়েছে, বাকি সব লুটপাট করে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত দুই অর্থবছরে সরকারি ভাবে শ্যামনগর উপজেলায় কাবিখা প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯৮০ মে. টন চাল। টিআর প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয় এক হাজার মে. টন চাল। এর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের অফিসের ছাদ সংস্কার (বিশ মে. টন) এবং মুক্তিযোদ্ধা সড়কে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও বাংলাদেশের মানচিত্র লাইটিং প্রকল্পে (বিশ মে. টন) বরাদ্দ ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলোর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। এভাবে সরকারি সম্পদ উন্নয়নের কাজে ব্যয় না করে কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের তিন কোটি বিশ লাখ টাকা লুটপাট হয়েছে।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্পে শ্যামনগর উপজেলায় পয়তাল্লিশ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকারি নিয়ম পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ করার কথা থাকলে এমপি, ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান নিজেরাই সরকারি নিয়ম ভেঙ্গে নিজস্ব লোকদের কাজ দিয়েছেন। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও কোন কাজ শুরু না করে প্রকল্পের সমুদয় টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে।
তবে উপজেলা প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম বলেন, কাজে হাত না দিলেও পরে করবে বলে ‘আন্ডারটেকিং’ দিয়েছে। তবে নিয়ম ভেঙ্গে কাজ দেয়ার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
[কাল পড়ুন :চাঁদার টাকায় উঠতি নেতারা কোটিপতি]